12.3 C
London
October 18, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ ঘোষণা

আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। হিজাব পরা ছাত্রীদের স্কুলে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে অনেক ছাত্রীকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে সহপাঠীদের ক্লাস করতে দেখতে হচ্ছে। কেউ কেউ এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়ছে। গত অক্টোবর থেকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ।

প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের দেশ আজারবাইজানের জনসংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম। তবে দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সরকারের নতুন বিধিনিষেধকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী আলি আসাদভ স্বাক্ষরিত ৩০৯ নম্বর ডিক্রির মাধ্যমে স্কুলের পোশাকবিধি সংশোধন করা হয়। ওই নির্দেশনায় সরাসরি হিজাবের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে অনুমোদিত স্কুল ইউনিফর্মের বাইরে অথবা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ৬ অক্টোবর আরেকটি ডিক্রির মাধ্যমে একই বিধিনিষেধ শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করা হয়।

অভিভাবক ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এসব নির্দেশনার ফলে হিজাব পরা ছাত্রীদের স্কুলের প্রবেশপথ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে হিজাব পরা শিক্ষকদেরও হিজাব খুলে ফেলতে অথবা চাকরি ছাড়তে বলা হচ্ছে।

রাজধানী বাকুর বালাখানি এলাকায় ৬৯ নম্বর স্কুলে হিজাব পরা সহপাঠীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে অন্য শিক্ষার্থীরা ক্লাসে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ৩২২ নম্বর স্কুলের প্রবেশপথেও শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে প্রতিবাদ করে। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে সুমগাইত, মাসাল্লি অঞ্চলের মোল্লাওবা গ্রাম এবং জিলাবাদে। একটি শহরে অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, তাদের মেয়েদের স্কুলে ঢুকতে না দিলে ছেলেদেরও স্কুলে পাঠাবেন না।

বিক্ষোভ ও অস্থিরতার মধ্যে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি ঘিরে ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে। বিধিনিষেধ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার সঙ্গে আটকাদেশের সম্পর্ক রয়েছে বলে পরিবারের দাবি, এমন এক ধর্মতত্ত্ববিদকে ৩০ দিনের প্রশাসনিক আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ১৩ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করা সাংবাদিক পোলাদ আসলানোভ কারাগারে অনশন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন।

সরকারের দাবি, নতুন বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য ধর্মনিরপেক্ষ ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষা করা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে ধর্মের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিষয়ও রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী ইরানের প্রভাব নিয়ে আজারবাইজানের উদ্বেগ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

চলতি মাসে ক্ষমতাসীন নিউ আজারবাইজান পার্টির কংগ্রেসে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ শিক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘আদর্শিক নিরাপত্তা’র গুরুত্ব তুলে ধরেন। সরকারপন্থী কয়েকজন ভাষ্যকার হিজাববিরোধী বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে ইরানের ‘রাজনৈতিক-আদর্শিক হস্তক্ষেপের’ সঙ্গে যুক্ত করেছেন। একটি সরকারঘনিষ্ঠ শিক্ষা সংস্থার অভিযোগ, বিদেশি অর্থায়ন ও প্রকল্পের মাধ্যমে হিজাবের বিষয়টি ব্যবহার করে দেশে কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে। বাকু ইরান ও তুরস্ক থেকে সমন্বিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণ চালানোর অভিযোগও তুলেছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রমাণ করতে সুনির্দিষ্ট সম্পর্কের প্রমাণ প্রয়োজন। কোনো পরিবারের মেয়ের শিক্ষার অধিকার নিয়ে দাবি তোলাকে সরাসরি বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কে এ ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীরা ‘২৮ ফেব্রুয়ারিকে আজারবাইজানে ফিরে আসতে দেবেন না’ লেখা ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ করেন। ১৯৯৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তুরস্কে সামরিক হস্তক্ষেপের পর হিজাব পরা নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা এবং সরকারি চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করতেই ওই তারিখটি ব্যবহার করা হয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রধান উপদেষ্টা ওকতাই সারাল হিজাব পরা ছাত্রীদের শিক্ষার অধিকার সীমিত করাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। দেশটির সাবেক মন্ত্রী ফাতমা শাহিনও আজারবাইজানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে আলিয়েভের দল তুরস্ক-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপতথ্য ও মানহানিমূলক প্রচারণা চালানোর অভিযোগ তুলেছে।

আজারবাইজানে হিজাব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১১ সালেও হিজাবসংক্রান্ত বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ হয়েছিল। ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।

বর্তমানে নতুন বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। ফলে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় হিজাব পরা ছাত্রীদের স্কুলে প্রবেশ ও নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এমকে

আরো পড়ুন

মার্কিন নাগরিকত্ব রেখে অন্য দেশের নীতিনির্ধারণে অংশ নেওয়া যাবে না

মানবিক ভিসা চালু করতে যাচ্ছে পর্তুগাল

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদ নিহত