যুক্তরাজ্যে সরবরাহ সংকটের কারণে হার্টবার্ন, অ্যাসিড রিফ্লাক্স ও পাকস্থলীর আলসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত ওষুধ ল্যান্সোপ্রাজল সীমিত পরিমাণে সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের জারি করা সিরিয়াস শর্টেজ প্রোটোকল বা এসএসপি অনুযায়ী, সংকট চলাকালে রোগীদের একবারে এক মাসের বেশি এই ওষুধ দেওয়া যাবে না।
ল্যান্সোপ্রাজলের ১৫ মিলিগ্রাম ও ৩০ মিলিগ্রাম মাত্রার জন্য ৯ সেপ্টেম্বর থেকে এসএসপি কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে এর মেয়াদ ২০২৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এই নির্দেশনা এর আগেও সংশোধন বা বাতিল করা যেতে পারে।
ল্যান্সোপ্রাজল হলো প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর বা পিপিআই শ্রেণির ওষুধ। এটি পাকস্থলীতে অ্যাসিড উৎপাদন কমায় এবং হার্টবার্ন, অ্যাসিড রিফ্লাক্স ও পাকস্থলীর আলসারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।
এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ল্যান্সোপ্রাজল প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখবার সরবরাহ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা বর্তমানে কতজন মানুষ ওষুধটি ব্যবহার করছেন, তা নির্দেশ করে না।
ন্যাশনাল ফার্মেসি অ্যাসোসিয়েশন বা এনপিএর চেয়ারম্যান অলিভিয়ের পিকার্ড ল্যান্সোপ্রাজল ব্যবহারকারী রোগীদের তাদের জিপি এবং ফার্মেসির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
পিকার্ড বলেছেন, সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক মাসের ওষুধে সরবরাহ সীমিত করা অথবা চিকিৎসাগতভাবে উপযুক্ত হলে অন্য মাত্রার ওষুধে পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে।
ল্যান্সোপ্রাজলের পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এনপিএ। এর মধ্যে রামিপ্রিল, অ্যাসপিরিন, কো-কোডামল এবং ক্রিয়ন রয়েছে।
রামিপ্রিলের কয়েকটি মাত্রার জন্যও গত সপ্তাহে নতুন সিরিয়াস শর্টেজ প্রোটোকল ঘোষণা করা হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকেই ওষুধটির সরবরাহ সংকটের কথা জানানো হয়েছে।
এনপিএ জানিয়েছে, সংকটে থাকা ওষুধ সংগ্রহের জন্য ফার্মাসিস্টদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। সরবরাহ পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিপিদের প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
পিকার্ড বলেছেন, উপযুক্ত ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টদের বিকল্প ওষুধ দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত, যাতে রোগীদের বিকল্প চিকিৎসার জন্য আবার জিপির কাছে যেতে না হয়।
জুলাই ও আগস্টের সরকারি তালিকা তুলনা করে দেখা গেছে, উভয় মাসের প্রাইস কনসেশন তালিকায় ১১৪টি ওষুধ ছিল। এই তালিকায় হৃদযন্ত্র, রক্তচাপ, মানসিক স্বাস্থ্য, স্নায়ুরোগ, ব্যথা, সংক্রমণ, ডায়াবেটিস, হরমোন এবং পাকস্থলীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ রয়েছে।
হৃদযন্ত্র ও রক্তচাপের ওষুধের মধ্যে রয়েছে এনালাপ্রিল, লিসিনোপ্রিল, পেরিন্ডোপ্রিল, রামিপ্রিল, ক্যান্ডেসারটান, অ্যামিওড্যারোন, ডিগক্সিন, ফ্লেকাইনাইড, অ্যাপিক্সাবান, রিভারক্সাবান, ওয়ারফারিন, বিসোপ্রোলল, কারভেডিলল, ল্যাবেটালল, নিফেডিপিন, ভেরাপামিল, অ্যাটোরভাস্টাটিন, ইজেটিমাইব, ফেনোফাইব্রেট, সিমভাস্টাটিন, অ্যাসপিরিন, ডাইপাইরিডামোল ও টিকাগ্রেলর।
মানসিক স্বাস্থ্য ও স্নায়ুরোগের ওষুধের মধ্যে রয়েছে গ্যাবাপেন্টিন, ল্যাকোসামাইড, ল্যামোট্রিজিন, লেভেটিরাসিটাম, ফেনোবারবিটাল, প্রেগাবালিন, ক্লোমিপ্রামিন, ফ্লুওক্সেটিন, মির্টাজাপিন, নরট্রিপটিলিন, সারট্রালিন, ভেনলাফ্যাক্সিন, ক্লোনাজেপাম, মেলাটোনিন ও জোলপিডেম।
ব্যথানাশক ওষুধের তালিকায় রয়েছে ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম, ইন্ডোমেথাসিন, মেলোক্সিকাম, নেফোপাম, কোডিন, কো-কোডামল, মরফিন সালফেট ও অক্সিকোডন।
অ্যান্টিবায়োটিক ও সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের মধ্যে রয়েছে অ্যামোক্সিসিলিন, ক্লোরামফেনিকল, কো-ট্রাইমক্সাজল, এরিথ্রোমাইসিন, ফ্লুক্লক্সাসিলিন, লাইমেসাইক্লিন, অক্সিটেট্রাসাইক্লিন, ক্লোট্রিমাজল, ইট্রাকোনাজল ও অ্যাসাইক্লোভির।
ডায়াবেটিস ও হরমোন-সংক্রান্ত ওষুধের মধ্যে রয়েছে ড্যাপাগ্লিফ্লোজিন, গ্লিক্লাজাইড, মেটফরমিন, বাইকালুটামাইড, লেভোথাইরক্সিন সোডিয়াম, প্রোজেস্টেরন ও ট্যামোক্সিফেন। এছাড়া ডেক্সামেথাসোন, হাইড্রোকর্টিসোন ও মোমেটাসোন-এর মতো কর্টিকোস্টেরয়েডও তালিকায় রয়েছে।
পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্রের ওষুধের মধ্যে রয়েছে ইসোমেপ্রাজল, গ্লাইকোপাইরোনিয়াম ব্রোমাইড, হায়োসিন বিউটাইলব্রোমাইড, ল্যান্সোপ্রাজল, প্রুক্যালোপ্রাইড, র্যাবেপ্রাজল ও অ্যাজাথায়োপ্রিন।
এছাড়া ডক্সাজোসিন, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, লেফ্লুনোমাইড, কুইনাইন সালফেট, লোরাটাডিন, অ্যাসকরবিক অ্যাসিড, কোলেক্যালসিফেরল, সায়ানোকোবালামিন, ফলিক অ্যাসিড, অরলিস্ট্যাট, ফেসোটেরোডিন, অক্সিবিউটিনিন, বেটাহিস্টিন, ডমপেরিডোন, প্রোক্লোরপেরাজিন, অ্যাটোমক্সেটিন, ট্রাভোপ্রস্ট, এপ্লেরেনোন ও ইন্ডাপামাইডসহ আরও বিভিন্ন ওষুধ তালিকায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্টের শেষ দিকে সরকারের প্রাইস কনসেশন তালিকায় ২৪৩টি ওষুধ ছিল। ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন করে আরও ১৩টি ওষুধ তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
প্রাইস কনসেশন তালিকায় কোনো ওষুধ যুক্ত হওয়ার কারণ হলো, ফার্মেসিগুলো যখন ড্রাগ ট্যারিফে নির্ধারিত NHS-এর পরিশোধমূল্যের সমান বা কম দামে ওই ওষুধ সংগ্রহ করতে পারে না, তখন সরকার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের অনুমতি দিতে পারে।
বাজারে কোনো ওষুধের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে ফার্মেসিগুলোকে নির্ধারিত NHS মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হতে পারে। এতে ওষুধ সংগ্রহ ও পর্যাপ্ত মজুত রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এনপিএ জানিয়েছে, ফার্মেসিগুলোতে প্রতিদিন ব্যবহৃত ওষুধের সরবরাহ সমস্যা বাড়ছে এবং রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ নিশ্চিত করতে ফার্মাসিস্টদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।
অলিভিয়ের পিকার্ড যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব ইভেট কুপারকে ওষুধের ঘাটতি এবং বৈশ্বিক ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে একটি টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্রঃ দ্য সান, কমিউনিটি ফার্মেসি ইংল্যান্ড, এনএইচএস ও ন্যাশনাল ফার্মেসি অ্যাসোসিয়েশন
এম.কে

