সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তার ও তথাকথিত ‘উত্তেজনা অর্থনীতি’র বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অনলাইনে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য সমাজের পারস্পরিক বিশ্বাসকে ধ্বংস করছে এবং এর ফলে সহিংসতা এমনকি দেশীয় সন্ত্রাসবাদও উসকে যেতে পারে।
কেমব্রিজে অনুষ্ঠিত এক ভুয়া তথ্যবিরোধী সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের আরও শক্তিশালী হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠবে। তিনি মনে করেন, বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ক্ষমতা বাড়ানো না হলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
গ্রেটার লন্ডন কর্তৃপক্ষের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই বছরে লন্ডনকে অত্যন্ত বিপজ্জনক শহর হিসেবে উপস্থাপন করা অনলাইন বর্ণনা ১৫০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে অভিবাসনের প্রভাব নিয়ে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রায় ৩৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাদিক খান বলেন, “প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা ঠিক, কিন্তু শুধু তাদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তারা ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের এমন ক্ষমতা থাকতে হবে, যাতে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।”
তিনি আরও প্রস্তাব করেন, গণতন্ত্রকে ভুয়া তথ্যের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য একটি নতুন কেন্দ্রীয় সংস্থা গঠন করা প্রয়োজন, যার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে পারবে।
লন্ডনের মেয়র দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে তাকে ঘিরে এমন বর্ণনা ছড়ানো হচ্ছে, যেখানে লন্ডনকে একটি ‘অধঃপতিত শহর’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে এবং দাবি করা হচ্ছে যে সেখানে অপরাধ দমন ব্যর্থ হয়েছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এসব ভুয়া তথ্যের একটি অংশ বিদেশি উৎস থেকে পরিচালিত হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী জড়িত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ তৈরি করে তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ছদ্মবেশে প্রচার করা হচ্ছে।
সাদিক খান বলেন, “এই নতুন ধরনের উত্তেজনা-নির্ভর অনলাইন অর্থনীতি আমাদের সমাজের মৌলিক আস্থাকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। এটি এখনই মোকাবিলা করা জরুরি।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, অনলাইনে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলে তা বাস্তব জীবনে সহিংস ঘটনার জন্ম দিতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি এক ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরেন, যেখানে এক ব্যক্তি অনলাইন ষড়যন্ত্র তত্ত্বে প্রভাবিত হয়ে একটি নজরদারি ক্যামেরা বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়। ওই ঘটনায় প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল এবং পরে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে সাদিক খান জোর দিয়ে বলেন, এই উদ্যোগ বাকস্বাধীনতা সীমিত করার জন্য নয়। বরং অনলাইনে ছড়ানো ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করাই এর মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “যারা এই সংকটকে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করতে চান, তারা যেন সেই মানুষদের কথা ভাবেন, যারা অনলাইনে তথ্য ফাঁসের কারণে হুমকির মুখে পড়ছেন, কিংবা যারা ধর্মীয় উপাসনালয়ে যেতে নিরাপদ বোধ করছেন না।”
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তার এখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। লন্ডনের মেয়রের এই আহ্বান ভবিষ্যতে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

