22.7 C
London
August 7, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে স্যোশাল হাউজিং থেকে বিদেশিদের বাদ দেওয়ার ঘোষণা কনজার্ভেটিভ দলের

যুক্তরাজ্যে বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক আবাসন থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে কনজারভেটিভ পার্টি। দলটির দাবি, ভবিষ্যতে বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক আবাসনের নতুন ভাড়ার চুক্তি থেকে বাদ দেওয়া হলে এবং কিছু ক্ষেত্রে বর্তমান ভাড়াটিয়াদেরও আবাসন ছাড়তে বাধ্য করা হলে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার বাড়ি ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জন্য উন্মুক্ত হতে পারে।

শুক্রবার প্রকাশ করা এই প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে সামাজিক আবাসনে বসবাসকারী এমন বিদেশি নাগরিকদের নতুন নিয়মের আওতায় আনা হবে, যারা যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক নন এবং যাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদাও নেই।

কনজারভেটিভ পার্টির হিসাব অনুযায়ী, সব বিদেশি নাগরিকের জন্য নতুন সামাজিক আবাসনের ভাড়ার চুক্তি বন্ধ করার পাশাপাশি এমন দম্পতিদের বর্তমান আবাসনের অধিকারও বাতিল করা হবে, যাদের দুজনের কেউই যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক নন। দলটির দাবি, এতে আনুমানিক ২ লাখ ২৮ হাজার ১৪৪টি বাড়ি ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জন্য উন্মুক্ত হতে পারে।

পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে ইংল্যান্ডে বর্তমানে সামাজিক আবাসনে থাকা কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য নন—এমন ভাড়াটিয়াদের ছয় মাসের মধ্যে তাদের বাড়ি ছেড়ে যেতে হতে পারে।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই উচ্ছেদের নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। ভবিষ্যতে নতুন সামাজিক আবাসনের জন্য যুক্তরাজ্যের নাগরিক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তিরা যোগ্য থাকবেন। তবে নতুন কোনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাগরিকের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা না থাকলে তিনি সামাজিক আবাসনের জন্য যোগ্য হবেন না।

বর্তমান নিয়মে স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পাওয়া বিদেশি নাগরিক, শরণার্থী মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট মানবিক সুরক্ষা পাওয়া ব্যক্তিরা সামাজিক আবাসনের জন্য যোগ্য হতে পারেন। অন্যদিকে আশ্রয়প্রার্থীরা সাধারণত সামাজিক আবাসনের জন্য যোগ্য নন, যদিও বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা থাকতে পারে।

কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া কর্ম ও পেনশনবিষয়ক মন্ত্রী হেলেন ওয়েটলি দাবি করেছেন, ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ অর্জনের সঙ্গে কাজ করা, কর দেওয়া এবং সমাজের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়টি যুক্ত থাকা উচিত।

তিনি বলেন, ব্রিটেনের কল্যাণব্যবস্থা সারা বিশ্বের মানুষের জন্য উন্মুক্ত ‘নগদ অর্থের যন্ত্র’ হতে পারে না। তার অভিযোগ, লেবার সরকার অভিবাসন ও কল্যাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং এর বোঝা ব্রিটিশ পরিবারগুলোকেই বহন করতে হচ্ছে।

ওয়েটলির দাবি, ব্রিটিশ পরিবারগুলো সামাজিক আবাসনের দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে। তাই কনজারভেটিভ পার্টি সরকারে ফিরলে বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক আবাসনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হবে এবং এর মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার বাড়ি ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।

তবে কনজারভেটিভদের এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছে লেবার পার্টি। দলটি প্রস্তাবটিকে ‘অবাস্তব, বাস্তবায়ন-অযোগ্য এবং রিফর্ম পার্টির কাছ থেকে নকল করা’ পরিকল্পনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। লেবারের বক্তব্য, এই নীতি যুক্তরাজ্যের আবাসন সংকটের কোনো কার্যকর সমাধান দেবে না।

আবাসনবিষয়ক দাতব্য সংস্থা শেল্টারের প্রধান নির্বাহী সারাহ এলিয়টও পরিকল্পনাটির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার ভাষায়, এটি একটি ‘বিভেদ সৃষ্টিকারী’ পরিকল্পনা, যার ফলে হাজার হাজার পরিবার ও বয়স্ক মানুষকে তাদের দীর্ঘদিনের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এলিয়ট বলেন, অনেক সামাজিক আবাসনের বাসিন্দা কয়েক দশক ধরে এসব বাড়িতে বসবাস করছেন। তারা নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করেন এবং সেই অর্থ আবার সরকারি অর্থব্যবস্থা ও সমাজে ফিরে যায়। তাই মানুষকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে গৃহহীনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।

শেল্টারের মতে, যুক্তরাজ্যের প্রকৃত প্রয়োজন নতুন সামাজিক আবাসন নির্মাণ করা। বিদেশি নাগরিকদের বর্তমান আবাসন থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নতুন বাড়ি তৈরি হবে না এবং আবাসন সংকটের মূল সমস্যারও সমাধান হবে না।

স্বাস্থ্যসেবা খাত থেকেও এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। রয়্যাল কলেজ অব নার্সিং সতর্ক করেছে, বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক আবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় কর্মরত অনেক নার্স ও অন্যান্য কর্মীর ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

সংগঠনটির বক্তব্য, স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কর্মীদের মধ্যে গুরুতর আবাসন-অনিশ্চয়তা তৈরি করা হলে তার প্রভাব রোগীদের সেবার ওপরও পড়তে পারে। যারা এই কর্মীদের আবাসন অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের দ্রুত এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে।

এদিকে ইংল্যান্ডের আবাসন জরিপের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ সালে সামাজিক আবাসনের প্রধান ভাড়াটিয়াদের ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছিলেন যুক্তরাজ্য বা আয়ারল্যান্ডের নাগরিক। বাকি ১১ দশমিক ৫ শতাংশ ছিলেন যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের বাইরের দেশের নাগরিক।

বর্তমানে ইংল্যান্ডের সামাজিক আবাসনে আনুমানিক ৪ লাখ ৭০ হাজার যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের বাইরের দেশের নাগরিক বসবাস করছেন।

ফলে কনজারভেটিভ পার্টির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সামাজিক আবাসনে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের ভবিষ্যৎ আবাসন অধিকার নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোর ওপর সম্ভাব্য উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের চাপ, গৃহহীনতার ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের আবাসন নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

কনজারভেটিভ পার্টি এই পরিকল্পনাকে ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক আবাসন উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধীরা বলছে, বিদ্যমান বাড়ি থেকে বিদেশি নাগরিকদের সরিয়ে দেওয়া আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। বরং নতুন সামাজিক আবাসন নির্মাণ বাড়ানোই সংকট মোকাবিলার কার্যকর পথ।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

নতুন লেবার সরকার: প্রপার্টি মার্কেট ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে লাইসেন্স পেতে মরিয়া চালকরাঃ ব্লুটুথ আর ভুয়া পরীক্ষার্থীতে ভরে উঠছে ড্রাইভিং সেন্টার

ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইইউ নাগরিকদের বসবাসের অধিকার নিয়ে কঠোর অবস্থানে যুক্তরাজ্য সরকার