বিশ্ববিখ্যাত লন্ডনের গ্রেট অর্মন্ড স্ট্রিট হাসপাতাল (জিওএসএইচ)-এ কর্মরত অঙ্গ-পুনর্গঠন সার্জন ইয়াসের জাব্বারের ত্রুটিপূর্ণ চিকিৎসায় প্রায় ১০০ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে “গভীরভাবে দুঃখজনক” বলে স্বীকার করেছে।
২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জিওএসএইচ-এ কর্মরত থাকা ইয়াসের জাব্বার মোট ৭৮৯ শিশুকে চিকিৎসা দেন। হাসপাতালের নিজস্ব প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে অন্তত ৯৪ জন কোনো না কোনোভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৯১ জন সরাসরি তার করা অস্ত্রোপচারের ফলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশ ছিল জটিল হাড়ের সমস্যায় ভোগা শিশু, যাদের অঙ্গ-দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাব্বারের চিকিৎসা পদ্ধতিতে বহু ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য চিকিৎসা মান বজায় রাখা হয়নি। ধাতব প্লেট, হাড়ের গ্রাফ্ট ও ইমপ্লান্ট ব্যবহারের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারে কিছু জটিলতা স্বাভাবিক হলেও, বহু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার, ভুল স্তরে হাড় কাটা, হাড় স্থিরকরণ ডিভাইস সময়ের আগেই খুলে ফেলা এবং জটিলতা শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ত্রুটি পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাব্বারের অপারেশন করা রোগীদের এক চতুর্থাংশেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৫ জন শিশু মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে। আরও এক শিশুর মারাত্মক ক্ষতির কথা বলা হলেও, সেটি অস্ত্রোপচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও প্রতিবেদনে পৃথক কেসের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা আগেই গণমাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বিরল হাড়ের রোগ নিয়ে জন্ম নেওয়া বান্টি নামের এক কিশোরীর ক্ষেত্রে একাধিক অস্ত্রোপচারের পর শেষ পর্যন্ত তার নিচের পা কেটে ফেলতে হয়। এটিকে ‘মাঝারি ক্ষতি’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হলেও তার পরিবার বলেছে, এই পরিণতি আগেই রোধ করা যেত।
আরেক ভুক্তভোগী টেটের মা লিজি রবার্টস জানান, তার ছেলের হাঁটুর অস্ত্রোপচারের কথা থাকলেও অনুমতি ছাড়াই গোড়ালিতে অস্ত্রোপচার করা হয়, যার ফলে সে এখনো কঠিন ব্যথায় ভুগছে। তাকে আরও অস্ত্রোপচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং পড়াশোনা পর্যন্ত বন্ধ করতে হয়েছে।
উভয় পরিবারই বিষয়টি পুলিশি তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিবেদনের ফলাফল পর্যালোচনা করে তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।
ইয়াসের জাব্বার, যিনি যুক্তরাজ্যেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে এবং তার বর্তমানে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা চর্চার লাইসেন্স নেই। বিবিসি তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালে জিওএসএইচ এই তদন্ত শুরু করে। স্বাধীন চিকিৎসকদের দিয়ে রোগীর রেকর্ড পর্যালোচনা করানো হলেও, চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি হাসপাতাল নিজেই সংকলন ও প্রকাশ করেছে। এর আগে রয়েল কলেজ অব সার্জনস (আরসিএস)-এর একটি পর্যালোচনায় কাজের পরিবেশকে “বিষাক্ত” এবং কিছু অস্ত্রোপচারকে “অনুপযুক্ত” ও “ভুল” বলে উল্লেখ করা হয়।
এনএইচএস ইংল্যান্ডের লন্ডন অঞ্চল এখন জিওএসএইচ-এর এই পর্যালোচনার ফলাফল খতিয়ে দেখছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা, কর্মীদের জন্য হুইসেল-ব্লোয়িং সহায়তা বাড়ানো এবং সবচেয়ে জটিল কেসগুলো অন্য বিশেষায়িত হাসপাতালের সঙ্গে যৌথভাবে পর্যালোচনার মতো সুপারিশ ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
জিওএসএইচের প্রধান নির্বাহী ম্যাথু শ এই ঘটনাকে হাসপাতালের ইতিহাসের “সবচেয়ে নির্মম দিন” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, উদ্বেগ উত্থাপিত হওয়ার পর হাসপাতাল দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, হাইপার-বিশেষায়িত সেবায় যেখানে হাতে গোনা কয়েকজন সার্জন কাজ করেন, সেখানে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে হাসপাতালের হারানো আস্থা ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হবে।
সূত্রঃ বিবিসি
এম.কে

