TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যের ম্যানস্টন আশ্রয়কেন্দ্রে মানবিক বিপর্যয়ঃ অতিরিক্ত ভিড়, নোংরা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় করে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্যবহৃত কেন্টের ম্যানস্টন আশ্রয়কেন্দ্রে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছিল—এমন তথ্য উঠে এসেছে চলমান এক প্রকাশ্য তদন্তে। তদন্তে বলা হয়েছে, কেন্দ্রটি ছিল অতিরিক্ত ভিড়পূর্ণ, নোংরা ও চরমভাবে অস্বাস্থ্যকর, যা আটক ব্যক্তিদের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করেছিল।

 

এই তদন্তে ২০২২ সালের ১ জুন থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালে ম্যানস্টনে কী ধরনের সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতির এতটা অবনতি ঘটে, তা বিশদভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো ওই সময়কালে আটক থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার কতটা লঙ্ঘিত হয়েছিল তা নিরূপণ করা।

শুনানিতে জানানো হয়, ২০২২ সালের শরতে সাবেক রয়্যাল এয়ার ফোর্স ঘাঁটিতে অবস্থিত এই কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে ডিফথেরিয়া ও স্ক্যাবিস রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। আশ্রয়প্রার্থীদের নোংরা মেঝে কিংবা চ্যাপ্টা কার্ডবোর্ডের ওপর ঘুমাতে বাধ্য করা হয়। টয়লেটগুলোতে মলমূত্র উপচে পড়ছিল এবং নারী ও শিশুদের অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে একই স্থানে রাত কাটাতে হতো। নিরাপত্তাকর্মীদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।

এই সংকটের মধ্যেই এক কুর্দি আশ্রয়প্রার্থী হুসেইন হাসিব আহমেদ ডিফথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২০২২ সালের ১৯ নভেম্বর হাসপাতালে মারা যান। একই সময়ে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগে এক অন্তঃসত্ত্বা সিরীয় নারী গর্ভপাতের শিকার হন, যা কেন্দ্রটির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতাকে সামনে আনে।

ম্যানস্টন কেন্দ্রটির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ছিল ১,৬০০ জন। কিন্তু সংকটের চূড়ান্ত সময়ে সেখানে প্রায় ৪,০০০ জনকে আটক রাখা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী আশ্রয়প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার বেশি সেখানে রাখার কথা না থাকলেও নথিপত্রে দেখা যায়, জুন থেকে নভেম্বর ২০২২ পর্যন্ত প্রক্রিয়াধীন ২৯,০০০ জনের মধ্যে অন্তত ১৮,০০০ জনকে এর চেয়ে অনেক বেশি সময় আটক রাখা হয়। আদালতে উপস্থাপিত নথিতে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে তারা পরিস্থিতির ওপর “সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন”।

এই তদন্তে স্বরাষ্ট্র দপ্তর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, ট্রেজারি ও বিচার মন্ত্রণালয়সহ চারটি সরকারি বিভাগ অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি ক্যাবিনেট অফিস, ১৭১ জন আশ্রয়প্রার্থী, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠন এতে যুক্ত রয়েছে। তদন্তে মোট ছয়টি আইন সংস্থা বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছে।

তদন্তের প্রধান আইনজীবী ক্লেয়ার ডবিন কেসি জানান, মানুষকে এমন পরিবেশে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আটক রাখা হয়েছিল, যা ওই উদ্দেশ্যে আদৌ উপযুক্ত ছিল না। তিনি বলেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও খারাপ হয়ে “অতিরিক্ত ভিড়, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর” রূপ নেয়।

মানসিক সুস্থতা ও শারীরিক নিরাপত্তাসহ যেসব বিষয় আশ্রয়প্রার্থীদের ঝুঁকিতে ফেলেছিল, সেগুলো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
তদন্তে ম্যানস্টনে কর্মরত কিছু কর্মীর আচরণও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রধান আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে কর্মরত কিছু ব্যক্তির অসদাচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা কেন্দ্রটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

২০২২ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ম্যানস্টনের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তের প্রতিশ্রুতি প্রথম দেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ক্লেভারলি। পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার এই তদন্তকে আইনগত তদন্ত থেকে স্বাধীন তদন্তে রূপান্তর করেন। ব্যয় সাশ্রয়ের যুক্তিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে তদন্তের ক্ষমতা সীমিত হলেও, ম্যানস্টনে ঘটে যাওয়া মানবিক বিপর্যয়ের পূর্ণ চিত্র তুলে আনার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

বরিস জনসনকে পার্লামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রস্তাব

পূর্ব লন্ডনে বৃষ্টির জন্য সতর্কতা, হতে পারে বন্যা!

বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে বিশৃঙ্খলা, চটেছেন ঋষি সুনাক