ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ইমাম ও উইসকনসিনের বৃহত্তম মসজিদের প্রধান সালাহ সারসুরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা যেতে পারে বলে রায় দিয়েছেন দেশটির এক ইমিগ্রেশন বিচারক।
যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন বিচারক জেমি সালিনার্ডি ট্রাম্প প্রশাসনের করা আবেদনের পক্ষে রায় দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের একটি বিরলভাবে ব্যবহৃত বিধানের আওতায় সারসুরকে বহিষ্কারযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে তার উপস্থিতি দেশটির পররাষ্ট্রনীতির জন্য সম্ভাব্য গুরুতর নেতিবাচক পরিণতি তৈরি করতে পারে।
রায়ের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর একটি স্মারকলিপিকে উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওই স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়েছিল, সারসুরের কর্মকাণ্ড ইহুদিবিদ্বেষ এবং ওয়াশিংটনের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত বিভিন্ন সংগঠনসংক্রান্ত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সারসুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি অতীতে হামাসের সদস্য ছিলেন অথবা সংগঠনটির জন্য অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করেছিলেন। তবে সারসুর এবং তার আইনজীবীরা এসব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে মার্কিন সরকারের আরও দুটি অভিযোগ—তিন দশকেরও বেশি আগে গ্রিন কার্ডের আবেদনে তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন এবং ভোট দেওয়ার সময় নিজেকে মিথ্যাভাবে মার্কিন নাগরিক হিসেবে দাবি করেছিলেন—সেগুলোও বিচারক গ্রহণ করেননি।
সারসুর ১৯৯৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং তার কোনো মার্কিন অপরাধমূলক রেকর্ড নেই। চলতি বছরের মার্চে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা বা আইসিই তাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ৮০ দিনেরও বেশি সময় আটক ছিলেন। জুনে এক ফেডারেল বিচারক তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। আদালত মনে করেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে তার সক্রিয়তার কারণে তাকে প্রতিশোধমূলকভাবে আটক করা হয়ে থাকতে পারে—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তিনি উত্থাপন করেছেন।
মার্কিন সরকারের মামলায় কয়েক দশক আগে ইসরায়েলি সামরিক আদালতে সারসুরের বিরুদ্ধে হওয়া কিছু দণ্ডের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। সারসুর ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার আইনজীবীদের দাবি, তাকে নির্যাতন ও চাপ প্রয়োগ করে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। শুনানিতে তার সাবেক ইসরায়েলি আইনজীবীও সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, সারসুরকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে তাকে যুক্ত করে এমন অপরাধে তার সাজা হয়নি।
সর্বশেষ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সারসুর এটিকে ‘গভীরভাবে হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—দুটিই রক্ষার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
তার প্রধান আইনজীবী প্যাট্রিক টরেল জানিয়েছেন, তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিচারক সারসুরকে বহিষ্কারের বিষয়ে মার্কো রুবিওর সিদ্ধান্ত এবং ইসরায়েলি সরকারি নথিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। সারসুর যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তাকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নিয়ে তার আইনজীবী প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে ইমিগ্রেশন বিচারকের এই রায়ের পরপরই সারসুরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা যাবে না। তার আইনজীবীদের বহিষ্কার ঠেকাতে আইনি সুরক্ষা চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি নিজ দেশে ফেরত গেলে নির্যাতনের শিকার হতে পারেন—এই আশঙ্কার ভিত্তিতেও তারা সুরক্ষা চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে বহিষ্কারযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে যে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সারসুরকে কোথায় পাঠানো হবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাকে ফেরত পাঠানো হলে তার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তার আইনজীবীরা জর্ডানে পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের দাবি, জর্ডানে সারসুরের বৈধভাবে বসবাসের অধিকার নেই।
মিলওয়াকিতে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় সারসুর ‘আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন’-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। কংগ্রেসের যেসব সদস্য তার মুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তারা তাকে গাজা যুদ্ধ নিয়ে সরব একজন অধিকারকর্মী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সারসুর আটক থাকার সময়ও ফিলিস্তিনিদের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন। তিনি গাজা ও ফিলিস্তিনে নিপীড়ন, যুদ্ধ এবং শিশুদের হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কথা বলেছিলেন।
মামলাটি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে কারণ এতে শীতল যুদ্ধের সময়কার একটি অভিবাসন আইনের বিধান একজন বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে। একই বিধান ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে ফিলিস্তিনপন্থী আরও কয়েকজন অধিকারকর্মীর মামলাতেও ব্যবহার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে সারসুর যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছেন এবং বহিষ্কার ঠেকাতে তার আইনি লড়াই অব্যাহত রয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও অন্যান্য আইনি সুরক্ষার আবেদন কীভাবে এগোয়, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করছে।
সূত্রঃ ফাইভ-পিলার্স
এমকে

