13.1 C
London
May 20, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হার পরিবর্তন, স্বস্তিতে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনে বাংলাদেশের রফতানি খাতে নতুন করে স্বস্তির সুর শোনা যাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত অতিরিক্ত শুল্কের একটি বড় অংশ বাতিল করে দেওয়ায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্কের চাপ কমেছে।

এর আগে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর ছিল। আদালতের রায়ে তা বাতিল হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। ফলে সামগ্রিক হিসাবে কার্যকর শুল্কহার আগের তুলনায় ৯ শতাংশ কমেছে। ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকরা এটাকে বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ স্বস্তি হিসেবে দেখছেন।

গত বছর জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় আরোপিত শুল্কের ফলে বাংলাদেশসহ বহু দেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাড়তি শুল্কের মুখে পড়ে। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় বেড়ে যায় এবং তার প্রভাব পড়ে সরবরাহব্যবস্থা, মূল্য নির্ধারণ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়পরিকল্পনায়।

সর্বোচ্চ আদালত ৬-৩ ভোটে রায় দিয়ে জানায়, উক্ত আইনের আওতায় এত বিস্তৃত পরিসরে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। এই ঘোষণার ফলে বাংলাদেশের ওপরে ১৯ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কও বাতিল হয়ে যায়।

তবে পরবর্তীকালে দেশটির ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারার অধীনে সাময়িকভাবে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করা হয়, যা পাঁচ মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়েছে। যদিও এতে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি, তবুও আগের তুলনায় কার্যকর শুল্কহার কমায় আমদানিকারক ও রফতানিকারক উভয় পক্ষই কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।

২০ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র দুই ধাপের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে—একটি স্বল্পমেয়াদি, অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থায় সে দেশের ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ধারা ১২২ ব্যবহার করে বেশিরভাগ আমদানিপণ্যের ওপর সাময়িকভাবে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এটি স্থায়ী কোনও সিদ্ধান্ত নয়, বরং আলোচনার সময় পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। নতুন এই শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট (ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম) থেকে কার্যকর হবে। আইন অনুযায়ী, এটি সর্বোচ্চ ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকতে পারবে— অর্থাৎ ২৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত।

এর আগে সরকার চাইলে শুল্ক তুলে নিতে বা পরিবর্তন করতে পারবে। ফলে এই সময়সীমা এখন বাণিজ্য আলোচনা ও দর-কষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসন আরও কঠোর ও লক্ষ্যভিত্তিক শুল্ক কাঠামো গড়তে চায়। এ জন্য তারা একই আইনের ধারা ৩০১ এর আওতায় ‘অন্যায্য বাণিজ্য আচরণ’ তদন্ত জোরদার করার পরিকল্পনা করেছে। এসব তদন্তের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দেশ বা খাতের ওপর বেশি ও দীর্ঘস্থায়ী শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এ ধরনের পদক্ষেপ ২০২৬ সালের শেষার্ধে কার্যকর হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রফতানি বাজার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের বড় অংশের ক্রয়াদেশ আসে এই বাজার থেকে। অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর থাকাকালে অনেক ক্রেতা মূল্যছাড় দাবি করেন, কেউ কেউ অর্ডার স্থগিত রাখেন। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা ও মুনাফায় চাপ তৈরি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকগুলো হলো—আমদানিকারকদের ব্যয় তুলনামূলক কমবে।

স্থগিত ক্রয়াদেশ পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মূল্যছাড়ের চাপ কিছুটা লাঘব হতে পারে। প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্য ব্যবধান আংশিকভাবে কমবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সুবিধা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়— চীন, ভিয়েতনাম, ভারতসহ অন্যান্য রফতানিকারক দেশও একই সিদ্ধান্তের আওতায় আসবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, শুল্ক বেশি হলে আমদানির পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়ে। দাম বাড়লে চাহিদা কমে যায়, বিক্রি হ্রাস পায় এবং রফতানিকারক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি বলেন, ‘‘১৯ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে শুল্ক কমে আসা নিঃসন্দেহে স্বস্তির। তবে মূল উদ্বেগের জায়গা হলো নীতিগত অস্থিরতা। বারবার শুল্কহার পরিবর্তন হলে আমদানিকারকরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তায় পড়েন। এতে বিকল্প উৎসের দিকে ঝোঁকার ঝুঁকি থাকে।’’

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের এই রায়ে বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনও ব্যতিক্রমী সুবিধা তৈরি হবে না, বরং এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যে স্বাভাবিকতা ফেরানোর একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।’’

তার ভাষায়, “বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আগেও ভালো করছিল। সেই ধারাবাহিকতাই এখন অব্যাহত থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের কারণে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাব ইউরোপের বাজারেও পড়েছে— সামগ্রিকভাবে বিক্রি কমেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাহিদা ও বিক্রি ধীরে ধীরে বাড়বে।”

তিনি আরও বলেন, ‘‘ভবিষ্যতে যদি নতুন কোনও শুল্ক কাঠামো বা নীতিগত পরিবর্তন না আসে, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহ স্থিতিশীল হবে। এতে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রফতানি ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’’

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, তবে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। উৎপাদন দক্ষতা, মানোন্নয়ন, সময়মতো সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে পারলে আগের চেয়ে বেশি সুবিধা নেওয়া সম্ভব।

“সব মিলিয়ে এটি একটি ইতিবাচক বার্তা। তবে চূড়ান্ত লাভ নির্ভর করবে আমরা ভেতরে কতটা প্রস্তুত ও সক্ষম হতে পারি তার ওপর,” যোগ করেন তিনি।

আদালতের রায়ের ফলে গত একবছরে আদায় করা বিপুল অঙ্কের শুল্ক ফেরতের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলতে পারে। একইসঙ্গে নতুন করে তদন্তের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে শুল্কহার বাড়ানোর ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।

ফলে বর্তমান স্বস্তি সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি— তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক কমা ইতিবাচক হলেও এটিই শেষ কথা নয়। বাংলাদেশকে এখন আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। বিশেষ করে— উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, পণ্যের মান উন্নয়ন, সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বাজার বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, নকশা উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা ব্যবস্থাপনার দিকে নজর বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ ও কৃষিপণ্যের রফতানি বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের রায় এবং পরবর্তী শুল্ক সমন্বয় বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। কার্যকর শুল্ক ৯ শতাংশ কমায় রফতানি খাতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে।

তবে এটি আংশিক স্বস্তি— সম্পূর্ণ সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা, কৌশলগত প্রস্তুতি এবং শিল্পখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

সব মিলিয়ে, সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন সেই সুযোগ কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট শুল্ক সংক্রান্ত আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেওয়ার পর দেশটির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (রেসিপ্রোকাল ট্রেড ডিল) পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন আজ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “প্রথমে আমরা চুক্তিটি বিশ্লেষণ করবো। এরপর সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে।” তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত চুক্তিতে একটি ‘এক্সিট ক্লজ’ বা প্রত্যাহার ধারা রয়েছে।

খাদিজা নাজনীন বলেন, “শুধু বাংলাদেশের চুক্তিতেই এ ধরনের এক্সিট ক্লজ রয়েছে। অন্য কোনও দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে শুল্কচুক্তি করেছে, তাতে এমন ধারা নেই। ফলে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে চুক্তিতে সই করেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অপর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ে পুরো চুক্তির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রায়ের ফলে চুক্তিটি বাতিল বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে বিষয়টি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে,” বলেন তিনি।

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

এম.কে

আরো পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে তসলিমার ‘লজ্জা’ নিষিদ্ধ করলেন মমতা!

২০ বছর পর বিএনপির সরকারঃ তারেক রহমানের নেতৃত্বে ছোট মন্ত্রিসভা, আলোচনায় যেসব নাম

সিলেট গোয়াইনঘাটে চোরাকারবারী ধরতে গিয়ে স্রোতে তলিয়ে গেলেন বিজিবি সদস্য