ব্রিটেনে এক চীনা নারীকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ভারতীয় নাগরিক দীপক সান্ধু (২৪)। পশ্চিম লন্ডনের আর্লস কোর্ট এলাকায় একটি এয়ারবিএনবি আবাসনে ওই নারীকে হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার ওল্ড বেইলি আদালতের জুরি তাকে হত্যা এবং বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। জুরিরা মাত্র দুই ঘণ্টার আলোচনার পর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
প্রসিকিউটর ক্যারোলিন কারবেরি কেসি আদালতে দীপককে ‘কল্পনাবিলাসী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নিজের মিথ্যা ও প্রতারণা ধরে ফেলায় জিয়াওছিং কে (৩৯) নামের ওই নারীর ওপর নৃশংস প্রতিশোধমূলক হামলা চালান দীপক।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষার্থী ভিসায় ভারত থেকে ব্রিটেনে আসেন দীপক। সাউদাম্পটন সোলেন্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ছয় মাস পর তার ভিসা বাতিল করা হয়।
অন্যদিকে, চীনা নাগরিক জিয়াওছিং কে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ভ্রমণ ভিসায় ব্রিটেনে আসেন। সাউদাম্পটনে কাজ করার সময় একটি যৌনপল্লিতে গ্রাহক হিসেবে দীপকের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়। পরে জিয়াওছিং লন্ডনে চলে গেলেও দুজনের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।
একপর্যায়ে জিয়াওছিং বুঝতে পারেন, তার হাতব্যাগ থেকে ৫০০ পাউন্ড চুরি করেছেন দীপক। এরপর দীপকের প্রতারণার বিষয়গুলো সামনে আসতে শুরু করে। আদালতকে জানানো হয়, নিজের কর্মকাণ্ড আড়াল করতে দীপক একের পর এক মিথ্যা গল্প তৈরি করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মডেলিংয়ের অডিশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন এবং মাসে ছয় হাজার পাউন্ড বেতনের ব্যাংকের চাকরির মিথ্যা দাবি করেন।
এ ছাড়া তিনি জিয়াওছিংকে বলেছিলেন, সাউদাম্পটনে তার বোনের সঙ্গে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে তার বোন তখন ভারতে ছিলেন।
দীপকের মিথ্যা বুঝতে পেরে জিয়াওছিং তার মুখোমুখি হন। তাকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলে আখ্যা দিয়ে টাকা ফেরত চান তিনি। একই সঙ্গে দীপককে তার কাছে আসতে নিষেধ করে বলেন, তিনি সবকিছু বুঝতে পেরেছেন এবং বোকা নন।
কিন্তু এরপরও দীপক তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন এবং একের পর এক আপত্তিকর ও হয়রানিমূলক বার্তা পাঠাতে থাকেন। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এক সহযোগীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনে দীপক প্রশ্ন করেছিলেন, ওই নারীর ওপর প্রতিশোধ নেওয়া উচিত কি না। জিয়াওছিংয়ের সাবেক নিয়োগকর্তাকেও তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, নিজের কাজের জন্য তাকে অনুতপ্ত হতে হবে।
২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি সুপারমার্কেট থেকে ছুরি কিনে সাউদাম্পটন থেকে লন্ডনে যান দীপক। পরদিন ১০ ডিসেম্বর আর্লস কোর্টের ওল্ড ব্রোম্পটন রোডের একটি আবাসনের শোবার ঘরের মেঝে থেকে জিয়াওছিংয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার গলায় গভীর ছুরিকাঘাতের ক্ষত ছিল।
দরজার ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, মাথায় বেসবল ক্যাপ দিয়ে মুখ আড়াল করে ওই আবাসনে প্রবেশ করেন দীপক। প্রায় ৯০ মিনিট পর তাকে সেখান থেকে বের হতে দেখা যায়।
হত্যাকাণ্ডের পর দীপক ভারতে থাকা তার বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বার্মিংহাম থেকে মুম্বাই যাওয়ার বিমানের টিকিট বুক করেন। তবে দুই দিন পর বার্মিংহাম বিমানবন্দরের দিকে যাওয়া ন্যাশনাল এক্সপ্রেসের একটি কোচ থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান পরিদর্শক ওয়েন জোলি বলেন, নিহত নারীর পরিবারকে অকল্পনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায়, দীপক জিয়াওছিংয়ের প্রতি অতিরিক্তভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং হত্যার আগে তাকে নিয়ন্ত্রণমূলক ও হয়রানিমূলক বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর আগের কয়েক মাসে কিংবা জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে জিয়াওছিংয়ের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া উচিত ছিল না।
নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ করা মেট্রোপলিটন পুলিশের অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে ওয়েন জোলি বলেন, এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখবে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এমকে

