TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

শ্রমবাজার খুলতে দেরি, ক্ষতির মুখে বাংলাদেশঃ কার স্বার্থে আটকে আছে মালয়েশিয়া অধ্যায়

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর আশা জাগলেও বাস্তবে তা দ্রুত উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর সফর এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও নিয়োগ পদ্ধতি, নতুন শর্ত এবং সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হালনাগাদের জটিলতায় শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী মাসে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান জট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তিনি শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে দুই দেশের ঐকমত্যের কথাও তুলে ধরেন। যদিও সিণ্ডিকেট ভাঙ্গা নিয়ে কথা প্রচলিত রয়েছে, মন্ত্রী নিজের পরিচিত প্রতিষ্ঠানকে সিন্ডিকেটে ঢুকানোর ব্যর্থতার কারণে সিন্ডিকেটের উপর ক্ষেপে আছেন।

গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের কাছে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ও আলোচনায় তোলেন। জবাবে আনোয়ার ইব্রাহীম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমিক প্রয়োজন হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, ন্যায্য, বৈষম্যহীন, সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক করার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে। এ লক্ষ্যেই বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আহ্বান করা হবে এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি হালনাগাদ সমঝোতা স্মারক প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। যদিও সমঝোতা স্মারক সংশোধন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। কারণ গত সমঝোতা স্মারক তৈরিতে প্রায় দুইবছর সময় লেগেছিল বলে তারা জানান। তাই দেশের স্বার্থে দ্রুত কর্মী প্রেরণ জরুরি বলে বিশ্লেষকেরা মতামত জানান।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মালয়েশিয়া বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং অন্যান্য শ্রমপ্রেরণকারী দেশের ক্ষেত্রেও নিয়োগ কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করছে। ফলে বাংলাদেশকে নিয়ে আলাদা কোনো দ্রুত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। দেশটির সরকার কর্মী নিয়োগে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রক্রিয়া ব্যবহারের চিন্তা রয়েছে। এ কারণে পূর্বের এফডব্লিউসিএমএস প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তে নতুন একটি কাঠামো তৈরির কাজ চলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন পদ্ধতি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বড় পরিসরে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। অতীতেও দেখা গেছে, কোনো সমঝোতা বা রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়ার পরপরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে যায়নি; বরং জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের একাধিক বৈঠক, শর্ত চূড়ান্তকরণ এবং নতুন এমওইউ স্বাক্ষরের পরই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এদিকে মালয়েশিয়ার দেওয়া ১০টি শর্ত নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বড় আকারের স্থায়ী অফিস থাকার মতো বিষয়। সমালোচকদের মতে, এসব শর্ত কার্যকর হলে সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সি বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে, যা নতুন করে সিন্ডিকেট তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেছেন, শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের বৈধ লাইসেন্সধারী হাজারো রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত না করা হলে আবারও বাজার সীমিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। তবে তার এই বক্তব্য নিয়েও দ্বিমত রয়েছে। আরেকপক্ষ মনে করেন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা এজেন্সিকে বিদেশে কর্মী প্রেরণের দায়িত্ব দিলে কর্মী হয়রানির ক্ষেত্রে সহজে জবাবদিহিতার ভিতরে আনা যাবে।

অভিবাসন গবেষক ড. তাসনিম সিদ্দিকীও মনে করেন, কোনো বিদেশি দেশ একতরফাভাবে সিন্ডিকেট চাপিয়ে দিতে পারে না; বাংলাদেশ চাইলে আলোচনার মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে সক্ষম। তবে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুততার সাথে কর্মী প্রেরণ হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সময়ক্ষেপণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত বিলম্ব হলে মালয়েশিয়া তার শ্রমঘাটতি পূরণে অন্যান্য দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ বাড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ বড় শ্রমবাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে এবং সম্ভাব্য বিপুল রেমিট্যান্স থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা প্রায় ৮ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে এখনো প্রায় ৫ হাজার কর্মী অপেক্ষমাণ রয়েছেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর তাদের জন্য চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।

তবে শ্রমবাজার ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনেও নানা আলোচনা রয়েছে। কিছু মহলে অভিযোগ রয়েছে, মালয়েশিয়ার প্রস্তাবিত শর্ত ও সম্ভাব্য এজেন্সি তালিকা নিয়ে অসন্তোষের কারণে সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ নতুন কাঠামো নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা সরকারি অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, তাদের মূল লক্ষ্য হলো সিন্ডিকেটমুক্ত, স্বচ্ছ এবং কর্মীবান্ধব নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত বা বাণিজ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার শুধু একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র নয়; এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা এবং লাখো পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তাদের মতে, যদি দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অপেক্ষমাণ শ্রমিকরা, কমবে সম্ভাব্য রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারাতে পারে। ফলে এখন প্রশ্ন একটাই—জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, নাকি শ্রমবাজার ঘিরে পুরোনো বিতর্ক ও স্বার্থের দ্বন্দ্বই আবারও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করবে?

সূত্রঃ ডেইলি এদিন

এম.কে

আরো পড়ুন

জেনে নিন যুক্তরাজ্যের মেরিট স্কলারশিপ সম্পর্কে

নিউজ ডেস্ক

দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসছেন লু, হবে ‘বহুমাত্রিক’ আলোচনা

বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিসে যোগ হলো ফ্রান্সের বিখ্যাত বেল্ট লোডার