সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের একটি স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিটের যাত্রা শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে গঠিত এই ইউনিটে ৪ হাজার ৫৯২ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশ সদর দপ্তরে ইউনিটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নতুন সাইবার পুলিশ ইউনিটের দায়িত্বে থাকবেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি মো. ইকবাল হোসেন। তার অধীনে ইউনিটটির কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপার (এসপি) ইউনিটটির নেতৃত্ব দেবেন। থানা পর্যায়েও সাইবার ইউনিটের জন্য উপপরিদর্শক (এসআই), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ও কনস্টেবল পর্যায়ের সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে।
পুলিশের বিদ্যমান সব সাইবার ক্রাইম বিভাগকে নতুন এই ইউনিটের আওতায় আনা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যমান জনবল থেকেই যতটা সম্ভব সদস্য দিয়ে ইউনিটের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পরে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিশ্চিত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার পুলিশ ইউনিটে আধুনিক সাইবার-সম্পর্কিত সরঞ্জাম থাকবে। প্রযুক্তি ও মেধানির্ভর এই সংগঠনের মাধ্যমে সাইবার স্পেস ব্যবহার করে সংঘটিত বিভিন্ন ধরনের অপরাধ মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাইবার-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ফলে অপরাধ তদন্ত ও মোকাবিলায় পুরোনো পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও ফরেনসিক সক্ষমতা প্রয়োজন। মাদক, সন্ত্রাস, আর্থিক অপরাধ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফরেনসিক ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এত দিন সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বিভিন্নভাবে অসংগঠিতভাবে কাজ করা হতো। এতে সমন্বয়ের কিছু সমস্যা ছিল। নতুন ইউনিট গঠনের মাধ্যমে সেই কার্যক্রমকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন ইউনিটে সাইবার অপরাধ তদন্ত ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সিস্টেম অ্যানালিস্ট, ফিন্যান্সিয়াল ডেটা অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট, ইমার্জেন্সি রেসপন্স কনসালট্যান্ট, নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, ডিজাস্টার রিকভারি এক্সপার্ট, কনটেন্ট ডেভেলপার, ক্রিপ্টো অ্যানালিস্ট, ম্যালওয়্যার অ্যানালিস্ট, ডার্ক ওয়েব অ্যানালিস্ট, কমিউনিকেশন এক্সপার্ট, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিস্ট এবং নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও সিকিউরিটি স্পেশালিস্টসহ বিভিন্ন পদ থাকবে।
এসব বিশেষজ্ঞকে চুক্তিভিত্তিকভাবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামোর ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য, নিয়মিত পুলিশি নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তবে পুলিশের মধ্যেও সাইবার অপরাধ ও প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নতুন ইউনিটে যুক্ত করা হবে। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী এবং উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন, তাদের দেশে ও বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে একটি দলকে বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পরে তারা নতুন ইউনিটের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেবেন। এ কারণে তাদের সাইবার অপরাধ ও প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন ইউনিটে বিশেষজ্ঞ হিসেবে যারা কাজ করবেন, তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আইন আরও আধুনিক করার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে বিভিন্ন অংশীজন, সংবাদকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মতবিনিময়ে সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীরা যাতে কোনোভাবেই সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের শিকার না হন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাইবার-সম্পর্কিত অপরাধগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার বিষয়ও নতুন আইনি কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
নতুন সাইবার পুলিশ ইউনিটের মাধ্যমে পুলিশের সাইবার অপরাধবিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমকে একীভূত করে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ প্রথম আলো
এমকে

