15.1 C
London
June 9, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

সাত দণ্ড, তিনবার অবৈধ প্রত্যাবর্তনঃ ইরাকি নাগরিককে বহিষ্কারে হোম অফিসের পথে আইনি বাধা

যুক্তরাজ্যে একাধিক গুরুতর অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত এক বিদেশি নাগরিককে পুনরায় নির্বাসনের উদ্যোগে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খেয়েছে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হোম অফিস। আপার ট্রাইব্যুনালের এক সাম্প্রতিক রায়ে ইরাকি নাগরিক সারওয়ান জামাল মোহাম্মদের বহিষ্কার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাওয়ায় দেশটির অভিবাসন নীতি ও নির্বাসন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, সারওয়ান জামাল মোহাম্মদ ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের হালাবজা এলাকার বাসিন্দা। গত প্রায় দুই দশকে তিনি ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে অন্তত তিনবার অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন। প্রতিবারই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে যৌন নিপীড়ন, মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধসহ মোট সাতটি ঘটনায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত হন বলে আদালতে উপস্থাপিত তথ্য থেকে জানা গেছে। এর আগে দুবার তাকে যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি পুনরায় অবৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশ করেন।

হোম অফিস সর্বশেষ তাকে আবারও ইরাকে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিলে বিষয়টি আপার ট্রাইব্যুনালে গড়ায়। সেখানে বিচারক মার্টিন নর্টন-টেইলর রায় দেন যে, প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র ও ভ্রমণ নথি ছাড়া তাকে বাগদাদে ফেরত পাঠানো হলে তিনি ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৩ নম্বর ধারার আওতায় অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

মানবাধিকার সনদের এই ধারায় নির্যাতন, অমানবিক আচরণ অথবা অবমাননাকর শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি থাকলে কাউকে সেই দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের আদালতগুলো অতীতেও ইরাকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ পুনর্বাসনের সক্ষমতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।

বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, হোম অফিস যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে যে বাগদাদে অবতরণের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কীভাবে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করবেন, কীভাবে নিরাপদে কুর্দিস্তান অঞ্চলে পৌঁছাবেন এবং ওই সময়ে তিনি কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হতে পারেন কি না।

শুধু নির্বাসন স্থগিত করেই ক্ষান্ত হয়নি আদালত। মামলাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে হোম অফিসের অযৌক্তিক আচরণের সমালোচনা করে ট্রাইব্যুনাল নির্দেশ দিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি ব্যয়ের ৯০ শতাংশ করদাতাদের অর্থ থেকে পরিশোধ করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

অভিবাসন কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনীতিকদের দাবি, বারবার অবৈধভাবে দেশে ফিরে আসা এবং একাধিক গুরুতর অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বহিষ্কারে বাধা সৃষ্টি করা বর্তমান আইনি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, এ ধরনের রায় জননিরাপত্তা এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

অন্যদিকে, মানবাধিকার আইনজীবীদের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তির অপরাধমূলক অতীত থাকলেও তাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার জীবন বা মৌলিক মানবাধিকার হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাদের মতে, আদালতের দায়িত্ব হলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি মামলার ঝুঁকি নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলাটি যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থার একটি জটিল বাস্তবতা সামনে এনেছে। একদিকে রয়েছে বিদেশি অপরাধীদের দ্রুত বহিষ্কারের জনদাবি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা।

এখন হোম অফিস পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। আপিলের পথ খোলা থাকলেও এই রায় ভবিষ্যতে একই ধরনের নির্বাসন সংক্রান্ত মামলাগুলোর ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

ফলে সারওয়ান জামাল মোহাম্মদের মামলাটি কেবল একজন দণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশি নাগরিককে ঘিরে নয়; বরং এটি যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবাধিকার আইন এবং করদাতাদের অর্থ ব্যবহারের মধ্যকার জটিল ভারসাম্য নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

বিনা নোটিশে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে নতুন বিলে

অনলাইন ডেস্ক

গাজায় ‘বিমান থেকে খাদ্য ফেলার’ পরিকল্পনা করছে যুক্তরাজ্য

বরিস জনসন ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে বিভ্রান্ত করেছেনঃ প্রতিবেদন