মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার ও ইন্দোনেশিয়াকে ঘিরে ‘বদর প্রতিরক্ষা চুক্তি’। প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়ন, যৌথ উৎপাদন এবং গবেষণার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর ধারণাকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছে দৈনিক আমার দেশ। তবে চুক্তির অস্তিত্ব, স্বাক্ষরের তারিখ, শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সূত্রে নিশ্চিত না করে এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে ড্রোন, সাঁজোয়া যান, যুদ্ধজাহাজ ও বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পাকিস্তানও বিমান, নৌ ও স্থল প্রতিরক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজস্ব উৎপাদন এবং রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কাতারের আর্থিক সক্ষমতা এবং ইন্দোনেশিয়ার শিল্পভিত্তি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান—এই দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে উঠলে তা যৌথ প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, উৎপাদন ব্যয় ভাগাভাগি এবং নিজস্ব শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভব। তবে এসব সুবিধা পেতে হলে শুধু চুক্তি স্বাক্ষর যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।
সৌদি আরবকে এই উদ্যোগের বাইরে রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। দৈনিক আমার দেশের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রনীতির পার্থক্য এই সমীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সৌদি আরবকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে—এমন দাবি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কিংবা চুক্তির নির্ভরযোগ্য নথি প্রয়োজন।
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক এবং অন্য মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সম্ভাবনাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার কারণ নেই। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে একাধিক দেশের সঙ্গে পৃথক চুক্তি ও সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমানো অনেক রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য। নিজস্ব প্রযুক্তি, স্থানীয় উৎপাদন এবং আঞ্চলিক অংশীদারত্ব বাড়ানো সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায়। তবে তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত সহযোগিতা বাস্তবে কতটা পশ্চিমা নির্ভরতা কমাতে পারবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদনের পরিমাণ এবং বাস্তব প্রকল্পের অগ্রগতির ওপর।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুক্তির প্রকৃতি। প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উৎপাদন বা প্রযুক্তি বিনিময়ের সমঝোতা এবং একটি দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দেশগুলো সামরিকভাবে সহায়তা দিতে বাধ্য—এমন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এক নয়। তাই ‘বদর’ উদ্যোগকে সম্মিলিত সামরিক জোট হিসেবে চিহ্নিত করার আগে এর প্রকৃত শর্ত ও বাধ্যবাধকতা জানা জরুরি।
চার দেশের মধ্যে কার্যকর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হলে তা মুসলিম দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এর ফলে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রভাব সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সূত্রঃ রয়টার্স
এমকে

