19.2 C
London
August 28, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

হরমুজ খুললে ইরানের সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের

হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দিলে তেহরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সম্প্রতি ঘোষিত ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামের কঠোর অর্থনৈতিক চাপের কর্মসূচিও বাতিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ এক সূত্রের বরাতে চ্যানেল আল আরাবিয়ার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সম্প্রতি তেহরান সফরের সময় ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাব ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেন। সফরে তিনি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেলের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকের আলোচনা ছিল ‘স্পষ্ট ও নির্ণায়ক’।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের মূল শর্ত হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক তেলবাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর পাশাপাশি ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধের নিশ্চয়তাও চেয়েছে ওয়াশিংটন।

বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ২৪ আগস্ট মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ঘোষিত ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ স্থগিত বা বাতিল করার পাশাপাশি ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার এবং দেশটির সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর চলমান নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন এই উদ্যোগকে চলতি বছরের জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের কিছু বিষয় পুনরুজ্জীবিত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই সমঝোতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতা কমানো এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।

এর আগে জুনে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার আওতায় মার্কিন নৌ-অবরোধ সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। একই সময়ে ইরানও হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেয়। কিন্তু পরে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। এতে সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাবের পরও নিজেদের দাবিতে অনড় রয়েছে ইরান। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। পাশাপাশি সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ১০০ থেকে ১২৩ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করা এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দেশটি।

এ ছাড়া পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে সার্বিক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের দাবিও রয়েছে তেহরানের। ফলে ওয়াশিংটনের দেওয়া প্রস্তাব এবং ইরানের চাওয়া শর্তের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।

এদিকে ২৪ আগস্ট মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে নতুন অর্থনৈতিক চাপ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য ইরানের অবশিষ্ট অর্থনৈতিক ভিত্তিগুলোকে আরও দুর্বল করা। ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহন খাতকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনকারী তৃতীয় কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানকেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বেসেন্ট বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘কন্টেইনমেন্ট’ বা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। এখন সেই নীতি থেকে সরে এসে তেহরানের সামনে বৈশ্বিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অথবা স্বাভাবিক অর্থনীতিতে ফিরে আসার পথ রাখা হয়েছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ছয় মাসে গড়ানোর মধ্যে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ চালু করেছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাঙ্কারসহ জাহাজে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করতে ওয়াশিংটন সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নেয়।

সর্বশেষ মার্কিন প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। তবে মহসেন রেজাই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে জানিয়েছেন, তেহরান বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চালিয়ে যাবে।

অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একতরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে বেইজিং ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক পরিবর্তন করবে না। ফলে মার্কিন চাপের মধ্যেও ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিবেচনায় এই জলপথে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করে কোনো টেকসই সমঝোতা হলে বৈশ্বিক তেলবাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে। বিপরীতে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সমঝোতার পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের নতুন প্রস্তাব তেহরানে পৌঁছানো সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই সর্বশেষ উদাহরণ। তবে হরমুজ খুলে দেওয়া ও প্রক্সি হামলা বন্ধের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ছাড়ের বিপরীতে ইরানের ক্ষতিপূরণ, সম্পদ মুক্তি, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ও আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির দাবির কারণে দ্রুত একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো এখনো কঠিন বলেই মনে হচ্ছে।

সূত্রঃ রয়টার্স \ আলজাজিরা

এম.কে

আরো পড়ুন

নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেলেন ট্রাম্প

দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক শাসন জারি

নিউজ ডেস্ক

জাতিসংঘ অধিবেশনে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু, গ্রেপ্তারের হুমকি থেকে সরে এলেন নিউইয়র্কের মেয়র