‘আমেরিকার নস্ত্রাদামুস’ নামে পরিচিত মার্কিন ভবিষ্যদ্বক্তা জন হোগের একাধিক ভয়াবহ পূর্বাভাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার দাবি, ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে পরমাণু সংঘাত, রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ এবং ২৭ বছরব্যাপী বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানের এক প্রতিবেদনের বরাতে মানবজমিন জানিয়েছে, জন হোগ প্রায় চার দশক ধরে ষোড়শ শতকের ফরাসি জ্যোতিষী ও ভবিষ্যদ্বক্তা মিশেল দ্য নস্ত্রাদামুসের লেখা বিশ্লেষণ করছেন। প্রাচীন এসব লেখার নিজস্ব ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তিনি বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পূর্বাভাস দিয়েছেন।
ইরানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য পরমাণু সংঘাতকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতিগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন হোগ। তার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানতে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে বলে তিনি ধারণা প্রকাশ করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে পরমাণু হামলার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা নিয়ে হোগ অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, এ বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান এখনো ‘৫০-৫০’। তবে এটি হোগের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন; যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ইরানে পরমাণু হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেননি।
হোগের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর প্রচলিত অস্ত্রের মজুত কমে গেলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আরও শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তার আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি যে ঘটবেই, তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
আরব সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং উত্তর কোরিয়ার আক্রমণাত্মক ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছেন হোগ। তার দাবি, সম্ভাব্য হামলায় মার্কিন বিমানবাহী রণতরি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা ডুবে যেতে পারে। এতে হাজার হাজার মার্কিন নাবিক ও মেরিন সেনার প্রাণহানির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
হোগের আরেকটি ভয়াবহ পূর্বাভাস হলো, বিশ্বজুড়ে ২৭ বছর ধরে চলতে পারে একটি বিধ্বংসী যুদ্ধ। তার দাবি, এ ধরনের সংঘাত মানবসভ্যতাকে দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার যুগে ঠেলে দিতে পারে। যুদ্ধের কারণে খাদ্য, পানি ও জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
এই পূর্বাভাসের ভিত্তি হিসেবে হোগ নস্ত্রাদামুসের লেখায় ‘মাবুস’ নামে এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বের উল্লেখ করেছেন। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণীতে এই ব্যক্তিকে তৃতীয় ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’ বা খ্রিষ্টবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নস্ত্রাদামুসের কথিত ভবিষ্যদ্বাণীর অনুবাদ তুলে ধরে হোগ দাবি করেন, তৃতীয় অ্যান্টিক্রাইস্টের পতনের পর ২৭ বছর ধরে যুদ্ধ চলবে। তার ব্যাখ্যায় এই সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি, বন্দিত্ব, নির্বাসন এবং রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে।
হোগের দাবি, ‘মাবুস’ নামটির অক্ষর বিন্যাস বিশ্লেষণ করে তিনি সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পেয়েছেন। তার আশঙ্কা, যুবরাজের আকস্মিক মৃত্যু গুপ্তহত্যা, প্রাসাদ অভ্যুত্থান কিংবা বিস্ফোরণে কোনো বিমানের বিধ্বস্ত হওয়ার মতো ঘটনার মাধ্যমে ঘটতে পারে।
তার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এমন কোনো ঘটনা ২৭ বছরব্যাপী যুদ্ধের সূচনা করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত পরমাণু সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করবে। তবে সৌদি যুবরাজকে ঘিরে এই দাবির পক্ষে কোনো যাচাই করা তথ্য বা নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তেল, হিলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসশিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছেন হোগ। তার মতে, এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। খাদ্য ও পানির সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে তিনি দাবি করেছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকেও সম্ভাব্য বৃহৎ সংঘাতের উৎস হিসেবে দেখছেন হোগ। তার পূর্বাভাস, ইউক্রেনে ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ বাড়ালে রাশিয়া ইউরোপের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে।
তার দাবি, ইউরোপের অস্ত্র কারখানা ও সামরিক অবকাঠামো রাশিয়ার হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এর জবাবে কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হলে আঞ্চলিক সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ কিংবা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে হোগের পূর্বাভাস কোনো নিশ্চিত সামরিক পরিকল্পনার প্রমাণ নয়। এসব বক্তব্য তার নিজস্ব বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুমাননির্ভর।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের অবসানও হোগের পূর্বাভাসের অন্যতম প্রধান অংশ। তার মতে, পশ্চিমা বিশ্বের প্রায় ৫০০ বছরের আধিপত্যের যুগের অবসান শুরু হয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতা বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
হোগ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কে একটি বিশেষ জ্যোতিষশাস্ত্রীয় চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘শোফার সাইলেন্স’ নামে অভিহিত এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানে অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে বলে তার দাবি।
তার পূর্বাভাসে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডিজেলের তীব্র সংকট, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, জাতীয় ঋণের বোঝা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হোগের মতে, এসব সমস্যা এবং ট্রাম্পের বিভাজনমূলক নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক প্রভাব দুর্বল করে দিতে পারে।
এমনকি ২০২৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পতনের সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন হোগ। দিনটি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ২৭তম বার্ষিকী হবে।
হোগের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ভয়াবহ পূর্বাভাসের উদ্দেশ্য আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বরং মানবজাতিকে সম্ভাব্য বিপর্যয় সম্পর্কে সতর্ক করা। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, বিশ্বনেতারা সংঘাত ও সহিংসতার পরিবর্তে শান্তির পথ বেছে নেবেন।
সূত্রঃ দ্য সান
এমকে

