বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাজ্য তার ঐতিহাসিক প্রভাব ও গুরুত্ব দ্রুত হারাচ্ছে—এমন দাবি উঠেছে এক বিশ্লেষণে। বিশ্লেষকদের মতে, গত ৫০০ বছরের মধ্যে ব্রিটেন কখনোই এতটা দুর্বল ও অপ্রাসঙ্গিক অবস্থানে ছিল না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিই এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে, যেখানে গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো ইস্যুতে যুক্তরাজ্য কার্যত উপেক্ষিত।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম ইউরোপ যে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছিল, সেই অধ্যায় কার্যত শেষের পথে। কল্যাণরাষ্ট্রভিত্তিক অর্থনীতি, অতিনিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিভীতি, জনসংখ্যাগত সংকট এবং সামরিক সক্ষমতা হ্রাস ইউরোপকে দুর্বল করে ফেলেছে। এর মধ্যে ব্রিটেন নিজের সিদ্ধান্তেই সেনাবাহিনী ছোট করেছে এবং ‘সফট পাওয়ার’-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ব্রিটেনের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে বলে মন্তব্য করা হয়। একসময় ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী মিত্র হলেও, এখন যুক্তরাজ্য কার্যত একটি নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ভাষা ব্যবহার করে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করলেও, শক্তি ও বাস্তব সক্ষমতার অভাবে তা কার্যকর হচ্ছে না।
প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা ও জ্বালানি উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার তুলনায় পশ্চিম ইউরোপ অনেকটাই পিছিয়ে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপ এখন খুব কম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছে। জ্বালানি নিরাপত্তায় ব্যর্থতা এবং রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
আরও বলা হয়, আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতি এমনভাবে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর হয়ে পড়েছে যে চাইলে ওয়াশিংটন সহজেই আর্থিক ও প্রযুক্তিগত চাপ প্রয়োগ করতে পারে। ডলার লেনদেন, ডেটা সার্ভার, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও যুক্তরাজ্যের অবস্থান উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করা হয়। একসময় ফকল্যান্ড যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ কিংবা আফগানিস্তানে বড় ভূমিকা রাখলেও, বর্তমানে সীমিত সামরিক সম্পদের কারণে বড় কোনো আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি ইউক্রেনে সম্ভাব্য শান্তিরক্ষী মিশনেও সামান্য অংশগ্রহণ দেশটির জন্য চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সূচকেও ব্রিটেনের অবস্থান নেমে গেছে। একসময় বিশ্বের শীর্ষ ধনী দেশ হলেও বর্তমানে ক্রয়ক্ষমতা সমতা অনুযায়ী মাথাপিছু জিডিপিতে দেশটির অবস্থান ৩৫তম। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে হলে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন জরুরি।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগ দেওয়া সমাধান নয়। বরং সামরিক ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা, সেনাবাহিনী সম্প্রসারণ, জ্বালানি উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে উদ্যোক্তা-ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

