যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ও আশ্রয়নীতিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। নতুন এক জরিপের বরাত দিয়ে দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ব্রিটেনের জন্য অভিবাসনকে ‘মূলত ক্ষতিকর’ মনে করেন—এমন মানুষের হার গত এক দশকে ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ২০১৬ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দেওয়া মানুষের মধ্যেও অভিবাসনকে ক্ষতিকর মনে করার হার ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে।
অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়টি ব্রিটিশ ভোটারদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যেই ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে এক ছোট নৌকায় ২৩০ জনের ব্রিটেনে পৌঁছানোর ঘটনা সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনে এটিকে একক ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে পৌঁছানোর রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন সরকার অবৈধ অভিবাসন ও ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের একসঙ্গে চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ঘটনা সরকারের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদনে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টির অভিবাসননীতির পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কনজারভেটিভ সরকারের সময়ে অভিবাসনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। অন্যদিকে লেবার সরকার অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ ও মানবিক বিবেচনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চাপে রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদের অভিবাসন ও আশ্রয়নীতিও এই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠোর অভিবাসননীতির পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নতুন ‘নিরাপদ ও বৈধ’ পথের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। লেবার পার্টির কিছু সংসদ সদস্য অবশ্য আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই নীতির কারণে দলটি প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন হারাতে পারে।
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সময়কার অভিবাসন ও আশ্রয়নীতির প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছে। তার আত্মজীবনীতে ব্রিটেনের আশ্রয়ব্যবস্থার পুরোনো ধারণা এবং পরবর্তী সময়ে সেটি বাস্তবায়নের জটিলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা টেনে বর্তমান অভিবাসন পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
এদিকে অভিবাসন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের ওপরও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোটারদের একটি অংশ অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন চায়। শুধু ধীরগতির বা সীমিত সংস্কার নয়, বরং আগত মানুষের সংখ্যা কমানো এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের আইনি অবস্থান নিয়ে কঠোর নীতি গ্রহণের দাবি রাজনৈতিকভাবে আরও জোরালো হতে পারে।
তবে অভিবাসন ইস্যুতে ব্রিটিশ সমাজে মতভেদও রয়েছে। একদিকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসনের সংখ্যা কমানোর দাবি জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে মানবিক কারণে আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষা এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বজায় রাখার পক্ষেও রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাজ্যের অভিবাসননীতি দেশটির রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইংলিশ চ্যানেলে ছোট নৌকায় মানুষের আগমন অব্যাহত থাকলে সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয়ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

