TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

অভিবাসন, অর্থনীতি ও নেতৃত্ব সংকটে বিদায় স্টারমারঃ রিফর্ম পার্টির চাপে বদলে যাচ্ছে ব্রিটিশ রাজনীতি

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মাত্র দুই বছর আগে ক্ষমতায় আসা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক যাত্রার নাটকীয় সমাপ্তি ঘটেছে। দলের অভ্যন্তরীণ আস্থাহীনতা, নীতিগত অস্পষ্টতা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের মুখে অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম বড় বিজয় অর্জন করেছিল লেবার পার্টি। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে দলটি দেশবাসীর কাছে স্থিতিশীলতা ও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে ক্রমশ চাপে পড়ে স্টারমার সরকার।

লেবার পার্টির একাধিক সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো রাজনৈতিক দর্শন বা দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা উপস্থাপন করতে না পারা। ভোটারদের কাছে তিনি একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে পরিচিত হলেও জাতীয় নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে করেন অনেকেই।

দলের ভেতরে অসন্তোষ এতটাই বেড়ে যায় যে স্থানীয় নির্বাচনে বিপর্যয়কর ফলাফলের পর তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দলীয় সংসদ সদস্যদের আস্থা হারিয়ে তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া আবেগঘন বক্তব্যে স্টারমার স্বীকার করেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি আর দলের সেরা পছন্দ নন। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন এবং পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের পতনের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ কাজ করেছে।

প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কার্যকর ফল দেখাতে ব্যর্থ হয় লেবার সরকার। এই ইস্যুতেই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধা নেয় নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম পার্টি।

তৃতীয়ত, একাধিক নীতি পরিবর্তন, বিতর্কিত নিয়োগ এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। সমালোচকদের মতে, সরকারের সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই পরস্পরবিরোধী ছিল এবং ভোটারদের কাছে পরিষ্কার বার্তা পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।

স্টারমারের পতনের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে রিফর্ম পার্টির দ্রুত উত্থানকে। ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম মুখ নাইজেল ফারাজ অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং জ্বালানি নীতিকে সামনে এনে প্রচলিত দুই দলের রাজনীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছেন।

সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচন এবং স্কটল্যান্ড-ওয়েলসের নির্বাচনী ফলাফল দেখিয়েছে, ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী দ্বিদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। লেবার ও কনজারভেটিভদের বাইরে তৃতীয় শক্তি হিসেবে রিফর্ম পার্টি দ্রুত জনসমর্থন অর্জন করছে।

দলের সদস্যসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নতুন করে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক সদস্য যোগ দেওয়ার ফলে রিফর্ম পার্টি এখন জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

স্টারমারের পদত্যাগের পর লেবার পার্টির নেতৃত্বে সবচেয়ে আলোচিত নাম সাবেক গ্রেটার ম্যানচেস্টার মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম। সাম্প্রতিক নির্বাচনে উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডে তার শক্তিশালী পারফরম্যান্স এবং রিফর্ম পার্টির বিরুদ্ধে কার্যকর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাকে অনেকেই “রিফর্ম স্লেয়ার” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

দলীয় নেতাদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ফারাজের জনপ্রিয়তাকে মোকাবিলা করতে হলে বার্নহামের মতো জনসম্পৃক্ত এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাসম্পন্ন নেতার প্রয়োজন।

দেশীয় রাজনীতিতে ব্যর্থ হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য ছিল স্টারমারের। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি প্রশংসা পেয়েছিলেন।

তবে ইরান-সংক্রান্ত সামরিক ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমালোচনা তার সরকারের ভাবমূর্তিতে নতুন চাপ তৈরি করে।

স্টারমারের বিদায়ের মাধ্যমে শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়নি; বরং ব্রিটিশ রাজনীতির একটি নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত মিলেছে। একদিকে রিফর্ম পার্টির উত্থান, অন্যদিকে লেবার পার্টির নেতৃত্ব পরিবর্তন—সব মিলিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের পতন প্রমাণ করেছে যে শুধু স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা সম্ভব হলেও, ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, কার্যকর নেতৃত্ব এবং জনগণের উদ্বেগের বাস্তব সমাধান। আর সেই জায়গাতেই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন কিয়ার স্টারমার।

সূত্রঃ রয়টার্স

এম.কে

আরো পড়ুন

ফিলিস্তিনিরা নিরাপত্তা না পেলে ইসরায়েলও নিরাপদ হবে না:ডেভিড ক্যামেরন

যুক্তরাজ্যে ভাড়াটিয়াকে বিভ্রান্ত করার দায়ে বাড়িওয়ালাকে £১১,০০০ জরিমানা

অপরাধীদের অভয়াশ্রমে পরিণত যুক্তরাজ্যঃ স্ত্রী হত্যার ভিডিও দিয়ে ভাইরাল অভিবাসীর কাহিনি