ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসে বিদেশি চিকিৎসক ও নার্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করেছেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক। তার মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্সের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারা অস্বাভাবিক।
বুধবার এলবিসি রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যাডেনক বলেন, ব্রিটেনের মানুষ এনএইচএস নিয়ে গর্ব করে। অথচ এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য কেন দেশের নিজস্ব জনশক্তি পর্যাপ্তভাবে গড়ে তোলা যাচ্ছে না, তা তার কাছে বিস্ময়কর। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য দেশ থেকে কর্মী নিয়োগের বিরোধিতা করেননি তিনি।
ব্যাডেনক বলেন, কোনো দেশের অর্থনীতি যদি অভিবাসন ছাড়া টিকে থাকতে না পারে, তাহলে সেই অর্থনৈতিক কাঠামো যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। কনজারভেটিভ পার্টি এমন একটি অর্থনীতি দেখতে চায়, যেখানে মানুষের আয় বেশি হবে এবং অভিবাসন কম থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী অভিবাসী কর্মী নিয়োগ করা যেতে পারে, তবে তাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এনএইচএসে স্থানীয় নার্সের সংখ্যা বাড়াতে বেতন বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেন কনজারভেটিভ নেতা। একই সঙ্গে নার্স হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বাধ্যতামূলক রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেন তিনি। তার মতে, উচ্চশিক্ষার ব্যয় ও ঋণের বোঝা অনেক তরুণকে নার্সিং পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
ব্যাডেনক বলেন, নার্সিং পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কী ধরনের বাধা রয়েছে, তা নিয়ে তার দল কাজ করছে। পুলিশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা পরিবর্তনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, নার্সিংয়ের ক্ষেত্রেও বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের ঋণ, বিশেষ করে প্ল্যান টু স্টুডেন্ট লোন নিয়েও তাদের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে।
হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের ২১৬টি দেশের নাগরিক ব্রিটেনের এনএইচএসে কাজ করছেন। নার্সদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক নন। স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পূর্ণকালীন কর্মরত নার্স ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকদের মধ্যে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৯৫৭ জনের মধ্যে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫০ জন ব্রিটিশ নাগরিক।
বিদেশি নার্সদের মধ্যে ৪২ হাজার ১৬৯ জন ভারতীয়, ২৫ হাজার জন ফিলিপিনো এবং ১২ হাজার ৬৪৬ জন নাইজেরীয় নাগরিক।
চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মীর অনুপাত আরও বেশি। প্রায় ৩৬ শতাংশ চিকিৎসক ব্রিটিশ নাগরিক নন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৯৮ হাজার ১৩০ জন চিকিৎসক ব্রিটিশ এবং ৫৭ হাজার ৯৮০ জন বিদেশি নাগরিক। বিদেশি চিকিৎসকদের মধ্যে ১২ হাজার ৬৮০ জন ভারতীয়, ৬ হাজার ৩১৫ জন পাকিস্তানি এবং ৪ হাজার ৩৯৭ জন মিশরীয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের পর থেকে এনএইচএসে কর্মরত আফ্রিকান ও এশীয় বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত কর্মীদের ধরে রাখার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে নাফিল্ড ট্রাস্ট।
সংস্থাটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডে চিকিৎসকদের মূল প্রশিক্ষণ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে আট বছর পর মাত্র ৫৬ শতাংশ এনএইচএসের হাসপাতাল ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত থাকেন। তাদের মধ্যে ২৪ শতাংশ প্রথম দুই বছরের মধ্যেই স্বাস্থ্যসেবা খাত ছেড়ে দেন।
এদিকে অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের অধিকার কঠোর করার উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে হাজার হাজার বিদেশি চিকিৎসক ও নার্স ব্রিটেন ছেড়ে চলে যেতে পারেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রোগীদের চিকিৎসাসেবায়।
হাউস অব কমন্সের স্বরাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির এক অনুসন্ধানে রয়্যাল কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স জানিয়েছে, এনএইচএসের জনবল সংকট পূরণে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি কর্মী ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে রয়্যাল কলেজ অব নার্সিং বিদেশি নার্সদের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ আরও দ্রুত দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এমকে

