যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা এবং জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এ যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সোমালিয়ায় যাওয়ার চেষ্টার দায়ে ইতালীয় নাগরিক মুহাম্মদ বিলালকে ১৩ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে লন্ডনের সেন্ট্রাল ক্রিমিনাল কোর্ট (ওল্ড বেইলি)।
বর্তমানে ১৯ বছর বয়সী বিলালকে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ম্যানচেস্টার বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পারে, তিনি সোমালিয়ায় গিয়ে আইএসের অধীনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়মতো তাকে আটক করা না হলে তিনি অন্তত তিন মাসের সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারতেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, বিলালের মোবাইল ফোনে বিপুল পরিমাণ সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত প্রচারণামূলক উপকরণ, চরমপন্থী সাহিত্য এবং রাইফেল ও সেমি-অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের উপায় নিয়ে ইন্টারনেটে অনুসন্ধানের তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া তিনি অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণের জন্য সম্ভাব্য শুটিং রেঞ্জ সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।
তদন্তে আরও উঠে আসে, বিলাল সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য হিসেবে বিভিন্ন গির্জা, ইহুদি উপাসনালয় (সিনাগগ) এবং ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক ফুটবল স্টেডিয়াম ওল্ড ট্র্যাফোর্ডকে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে ডার্ক ওয়েব থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কেনার পরিকল্পনাও করেছিলেন বলে আদালতে জানানো হয়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির দুটি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উপযোগী তথ্য সংগ্রহের চারটি অভিযোগ আনা হয়। পরে তিনি সব অভিযোগ স্বীকার করেন।
রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি মিসেস জাস্টিস চিমা-গ্রাব বলেন, প্রবেশন কর্মকর্তার কাছে বিলাল নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে সাধারণ মানুষকে হত্যা করার ইচ্ছা ছিল তার এবং পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ারও আশা করেছিলেন। বিচারকের ভাষায়, তিনি শেষ পর্যন্ত হামলা চালাতেন না—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব ছিল না।
আদালত আরও জানায়, ২০২৪ সালজুড়ে বিলাল প্রকাশ্যে ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং সংগঠনটির প্রচারণামূলক বিপুল পরিমাণ উপকরণ সংগ্রহ করেন। ডিসকর্ড প্ল্যাটফর্মে তিনি আইএসের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে দাবি করেছিলেন যে তিনি মুসলমানদের রক্ষা করছেন এবং যাদের অন্যরা সন্ত্রাসী বলে, তিনি তাদের ন্যায়বিচারের যোদ্ধা হিসেবে দেখেন।
তবে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বিলাল দাবি করেন, তিনি সহিংস ব্যক্তি নন; তিনি কেবল “অপরিণত ও বিরক্ত” ছিলেন এবং “রোদ উপভোগ করার জন্য” সোমালিয়ায় যাচ্ছিলেন। আদালত তার এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি।
আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, অপরাধ সংঘটনের সময় বিলালের বয়স ছিল ১৭ বছর। ১৩ বছর বয়সে ইতালি থেকে যুক্তরাজ্যে আসার পর তিনি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং চরমপন্থী মতাদর্শের প্রভাবে মগজধোলাইয়ের শিকার হন।
তবে বিচারপতি চিমা-গ্রাব বলেন, তিনি এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন। তার মতে, বিলাল নিজ উদ্যোগেই উগ্রপন্থার পথে এগিয়েছিলেন এবং তার কর্মকাণ্ডের পেছনে ইসলামিক স্টেটের আদর্শ ও ‘শহীদ’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে অনলাইনে চরমপন্থী প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধকরণ এবং বিদেশে গিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নজরদারি জোরদার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি দেখিয়েছে যে অনলাইন উগ্রবাদ কত দ্রুত তরুণদের সহিংসতার পথে ঠেলে দিতে পারে এবং সময়মতো গোয়েন্দা তৎপরতা বড় ধরনের হামলা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

