যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টাডি ভিসা দেওয়ার সংখ্যা গত তিন বছরে ৪১ শতাংশ কমেছে। নতুন এই পরিসংখ্যান দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে ইউনিভার্সিটিজ ইউকে।
হোম অফিসের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০টি স্পনসরড স্টাডি ভিসা দেওয়া হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ১১ শতাংশ কম। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে স্টাডি ভিসা দেওয়ার সর্বোচ্চ সংখ্যার তুলনায় এবার তা ৪১ শতাংশ কমেছে।
২০২৪ সালের শুরুতে তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা ব্যবস্থায় বেশ কিছু বিধিনিষেধ চালু করে। এর আওতায় অধিকাংশ বিদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসার সুযোগ সীমিত করা হয়। হোম অফিস জানিয়েছে, এই বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টাডি ভিসা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ইউনিভার্সিটিজ ইউকের প্রধান নির্বাহী ভিভিয়েন স্টার্ন বলেছেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া টিউশন ফি দেশীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই অর্থ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ তৈরির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমেও অর্থায়ন করে।
তিনি বলেন, ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সরকার যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার অর্থায়নের একটি অংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া ফি দিয়ে পূরণের প্রত্যাশা করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অর্থায়ন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।
ভিভিয়েন স্টার্ন আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে থাকলে ব্রিটিশ শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং দেশটির অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এদিকে বর্তমান লেবার সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি-এর ওপর একটি লেভি আরোপের পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ২২০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী বাদ দিয়ে এরপর ভর্তি হওয়া প্রত্যেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে ৯২৫ পাউন্ড করে দিতে হবে। সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ কিছু দেশীয় শিক্ষার্থীর জন্য মেইনটেন্যান্স গ্রান্ট দিতে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ইউনিভার্সিটিজ ইউকের প্রধান নির্বাহী এই লেভি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মেইনটেন্যান্স গ্রান্ট পুনরায় চালুর সরকারি লক্ষ্যকে তারা সমর্থন করেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর লেভি আরোপের পরিকল্পনা অস্থিতিশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও দুর্বল করতে পারে।
তিনি সরকারের প্রতি এই নীতির অর্থায়নের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
হোম অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি স্টাডি ভিসা পেয়েছেন চীনা নাগরিকরা। তাদের জন্য ৮৬ হাজার ৩০০টির বেশি ভিসা দেওয়া হয়েছে। তবে আগের ১২ মাসে প্রায় ৯৯ হাজার ৯০০টি ভিসা দেওয়ার তুলনায় এবার চীনা শিক্ষার্থীদের ভিসা ১৬ শতাংশ কমেছে।
চীনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক স্টাডি ভিসা পেয়েছেন ভারতীয় নাগরিকরা। প্রায় ৮২ হাজার ৫০০টি ভিসা দেওয়া হয়েছে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ১৯ শতাংশ কম।
পাকিস্তানি নাগরিকদের স্টাডি ভিসা পাওয়ার সংখ্যায় আরও বড় পতন হয়েছে। হোম অফিসের হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের স্টাডি ভিসা ৪৭ শতাংশ কমেছে।
পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ৬২ শতাংশ মাস্টার্স কোর্সে পড়াশোনার জন্য আসেন। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে মাস্টার্স পড়াশোনার জন্য দেওয়া স্টাডি ভিসার সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজারের কিছু কম, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কম।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা কমে যাওয়ার এই প্রবণতার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন, গবেষণা কার্যক্রম এবং দেশীয় শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগের ওপর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ফি-নির্ভরতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইউনিভার্সিটিজ ইউকের পক্ষ থেকে বর্তমান অর্থায়ন পদ্ধতির স্থায়িত্ব নিয়ে সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সূত্রঃ যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের ইমিগ্রেশন সিস্টেম স্ট্যাটিস্টিকস।
এম.কে

