TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ইংল্যান্ডে শতবর্ষী গ্রামের বুকে হাজারো নতুন বাড়ির পরিকল্পনাঃ ক্ষোভে ফুঁসছে বাসিন্দারা

ইংল্যান্ডের সাফোকের ছোট ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম হাইহ্যাম এখন বড় ধরনের আবাসন নির্মাণ পরিকল্পনাকে ঘিরে আলোচনায়। মাত্র ১৫৫ জন বাসিন্দার এই গ্রামে ব্যাপক পরিসরে নতুন বাড়ি নির্মাণের প্রস্তাব উঠেছে। তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, বড় আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কয়েক শত বছরের পুরোনো গ্রামের স্বতন্ত্র চরিত্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাবে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় পরিষদের এক সভায় একটি আবাসন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হাইহ্যামে বড় পরিসরে নতুন বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। পরিকল্পনাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে স্থানীয় নথিতে হাইহ্যামকে ভবিষ্যৎ আবাসন সম্প্রসারণের সম্ভাব্য এলাকা হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি উঠে এসেছে।

গ্রামটি বুরি সেন্ট এডমন্ডসের পশ্চিমে অবস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের কাছাকাছি হওয়ায় এর অবস্থানকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। বুরি সেন্ট এডমন্ডস ও নিউমার্কেটের মাঝামাঝি অবস্থানের পাশাপাশি কেমব্রিজ থেকেও গ্রামটির দূরত্ব মাত্র ২০ মাইলের কিছু বেশি।

বর্তমানে হাইহ্যামের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। কাঠের বিমযুক্ত পুরোনো বাড়ি, স্থানীয় পাথরে তৈরি দেয়াল, প্রশস্ত নুড়িপাথরের পথ এবং চারপাশের বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর গ্রামটিকে একটি ঐতিহ্যবাহী ইংরেজ গ্রামীণ জনপদের রূপ দিয়েছে। অনেক বাড়িই কয়েক শত বছরের পুরোনো এবং এগুলো এলাকার প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।

গ্রামের বাড়ির দামও যথেষ্ট বেশি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি এক-কক্ষের সারিবদ্ধ বাড়ি ২ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়। একই বছরের অক্টোবরে চার-কক্ষের একটি স্বতন্ত্র বাড়ি বিক্রি হয় ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ পাউন্ডে।

তবে নতুন আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাইহ্যামের বর্তমান চেহারা আমূল বদলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

৬৬ বছর বয়সী বিন জনস্টন গত বছর অন্যত্র চলে যাওয়ার আগে ৩৬ বছর হাইহ্যামে বসবাস করেছেন। তিনি গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, গ্রামের উঁচু এলাকার দিক থেকে ১৬ মাইল দূরে দিগন্তে ইলি ক্যাথেড্রালের দৃশ্য দেখা যায়। পুরো উপত্যকাটিও এখনো প্রায় অক্ষত এবং সেখানে বিদ্যুতের খুঁটির উপস্থিতিও নেই।

নতুন আবাসন পরিকল্পনার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, প্রকল্পটি বর্তমান বসতিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে এবং হাইহ্যামের ঐতিহ্যবাহী ছোট গ্রামীণ জনপদের বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি মুছে দেবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, একবার বড় পরিসরে নির্মাণকাজ শুরু হলে গ্রামের ঐতিহাসিক পরিবেশ আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

স্থানীয় বাসিন্দা রেবেকা টার্নারের কাছেও বিষয়টি অত্যন্ত আবেগের। তিনি হাইহ্যামেই জন্মেছেন এবং এখনো এলাকায় বসবাস করেন। ১৯৮০-এর দশকে গ্রামের গির্জায় তাঁর বাপ্তিস্ম হয়েছিল। ২০১৫ সালে একই গির্জায় তাঁর মেয়েরও ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়।

তিনি জানান, গির্জার পুরোনো নথিতে তাঁর নিজের অনুষ্ঠানের তথ্যের মাত্র এক-দুই পৃষ্ঠা পরেই তাঁর মেয়ের অনুষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। তাঁর বাবা একসময় গ্রামের পানশালায় হেঁটে যেতেন এবং শিশুরা পোস্ট অফিসে গিয়ে মিষ্টি কিনত—এমন বহু স্মৃতি তাঁর পরিবারের সঙ্গে গ্রামের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।

এই ঐতিহ্যবাহী গ্রামের জায়গায় বড় আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে তিনি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে মনে করেন।

আরেক বাসিন্দা পেটুলা স্টোনের উদ্বেগ আরও বিস্তৃত। তার মতে, বিপুলসংখ্যক নতুন মানুষের বসতি স্থাপনের মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো হাইহ্যামে নেই। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি এ১৪ মহাসড়কের সক্ষমতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, মহাসড়কটি এরই মধ্যে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে।

তবে নতুন বাড়ির প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। সরকারি আবাসন চাহিদা পূরণের লক্ষ্যমাত্রার কারণে পশ্চিম সাফোক পরিষদকে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ১০০টি নতুন বাড়ির ব্যবস্থা করতে হয়।

বিদ্যমান বড় গ্রাম সম্প্রসারণ অথবা সম্পূর্ণ নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার মাধ্যমে এই চাহিদা পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

২০২৪ সালের শেষ দিকে পশ্চিম সাফোক পরিষদের আবাসন তালিকায় ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার জনের আবাসনের প্রয়োজন ছিল জরুরি পর্যায়ের। একই সময়ে গৃহহীনতা মোকাবিলায় ৬ লাখ ১২ হাজার পাউন্ড বিনিয়োগের কথাও জানা যায়।

আবাসন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাইহ্যাম এস্টেটের সঙ্গে অংশীদারত্বে একটি টেকসই নতুন জনবসতি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্ধারিত জনসংখ্যা ও আবাসন বৃদ্ধির চাহিদা পূরণে স্থানীয় পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নতুন বাড়ির প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে কেন একটি ঐতিহ্যবাহী ও এখনো প্রায় অক্ষত গ্রামাঞ্চলকে বেছে নিতে হবে?

বাসিন্দাদের আশঙ্কা, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু বাড়ির সংখ্যা বাড়বে না—পরিবর্তন হয়ে যাবে পুরো এলাকার জীবনযাত্রা, পরিবেশ ও ঐতিহাসিক পরিচয়।

স্থানীয়দের একজনের ভাষায়, গ্রামাঞ্চল একবার হারিয়ে গেলে তা আর কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

এখনো পরিকল্পনাটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত হাইহ্যামের কতটা পরিবর্তন হবে, কিংবা আদৌ বড় ধরনের আবাসন প্রকল্প অনুমোদন পাবে কি না, তা নির্ভর করছে স্থানীয় পরিকল্পনা প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

সূত্রঃ মেট্রো, বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

নতুন বছরে বাড়লো প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা

অনলাইন ডেস্ক

গাজায় ত্রাণকর্মী হত্যার তদন্ত বন্ধঃ ইসরায়েলের সিদ্ধান্তে যুক্তরাজ্য-কানাডার তীব্র নিন্দা

রুয়ান্ডা ফ্লাইটের প্রস্তুতিতে যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট কর্মীদের ছুটি বাতিল