21.8 C
London
September 19, 2026
TV3 BANGLA
মুক্তমতযুক্তরাজ্য (UK)

হোম অফিস আবেদন ফি বাণিজ্য —  বছরে ৫ বিলিয়ন পাউন্ড লাভ

নাশীত রহমান || লন্ডন || ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

বিউরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (TBIJ)‑এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অভিবাসন‑সংক্রান্ত ভিসা, নাগরিকত্ব ও অন্যান্য ফি থেকে হোম অফিস যে আয় করছে, তা প্রকৃত প্রশাসনিক ব্যয়ের তুলনায় বহু গুণ বেশি। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকার প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড মুনাফা করেছে এসব চার্জ ও ফি থেকে।

ফি / আয় উৎস পরিমাণ (£) বিবরণ
ILR আবেদন ফি £3,226 ২০০৫ সালের £155 থেকে বেড়ে বর্তমান £3,226; প্রকৃত প্রসেসিং খরচ মাত্র £310।
ILR প্রকৃত প্রশাসনিক ব্যয় £310 হোম অফিসের হিসাব অনুযায়ী ILR আবেদন প্রসেস করতে প্রকৃত খরচ।
পার্টনারকে যুক্ত হতে পরিবার ভিসা £2,064 পরিবার পুনর্মিলন ভিসার বর্তমান আবেদন ফি।
প্রাপ্তবয়স্ক নির্ভরশীল আত্মীয় ভিসা £3,635 Adult Dependant Relative আবেদন ফি; অতিরিক্ত চার্জ যুক্ত হতে পারে।
চার সদস্যের পরিবারের সেটেলমেন্ট মোট খরচ £15,000+ একটি পরিবারের উদাহরণ; প্রকৃত খরচ £1,240 হলেও ফি কাঠামোর কারণে মোট ব্যয় £15,000 এর বেশি।
হোম অফিসের মোট আয় (2024–25) £7.3 বিলিয়ন NAO রিপোর্ট অনুযায়ী; ব্যয় ছিল £27.8 বিলিয়ন।
ভিসা ও অভিবাসন থেকে আয় (2025–26) £3.57 বিলিয়ন আগের বছরের £2.98 বিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি; উদ্বৃত্ত £2.5 বিলিয়ন।
ভিসা ও অভিবাসন আয় উদ্বৃত্ত (2025–26) £2.5 বিলিয়ন হোম অফিসের হিসাব অনুযায়ী।
ইমিগ্রেশন স্কিলস চার্জ (ISC) £594 মিলিয়ন এই অর্থ HM Treasury‑তে যায়; হোম অফিসে থাকে না।
অভিবাসন সিভিল পেনাল্টি £111 মিলিয়ন জরিমানা থেকে অর্জিত আয়।
ইমিগ্রেশন হেলথ সারচার্জ (IHS) আয় (2025–26) £2.32 বিলিয়ন আগের বছরের £2.42 বিলিয়ন থেকে সামান্য কম; স্বাস্থ্য বিভাগ ও ডেভলভড সরকারে বণ্টিত হয়।

 

হোম অফিস জানায় যে ইমিগ্রেশন হেলথ সারচার্জ (IHS) থেকে যে আয় হয়, তা যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যয়ের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে বণ্টন করা হয়। এই বণ্টন বার্নেট ফর্মুলা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, যার মাধ্যমে ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগ এবং স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সরকারগুলো তাদের জনসংখ্যা ও প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ পায়। অর্থাৎ, অভিবাসীরা যে স্বাস্থ্য সারচার্জ প্রদান করে, সেই অর্থ সরাসরি NHS‑এর সেবা ও আঞ্চলিক স্বাস্থ্য বাজেটকে সমর্থন করে।

অভিবাসী শ্রমিক সহায়তা সংস্থা Tulia‑র সিইও এবং সলিসিটর রুম্বিদজাই বুনজাওয়াবায়া বলেন যে সরকার খুব ভালোভাবেই জানে মানুষ যুক্তরাজ্যে থাকতে কতটা মরিয়া। এই মরিয়া অবস্থাকে সরকার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে—উচ্চ ফি, অতিরিক্ত চার্জ এবং কঠোর নিয়মের মাধ্যমে অভিবাসীদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানো হচ্ছে। তার মতে, আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই চাপ সৃষ্টি করার পর আবার অভিবাসীদেরই দোষারোপ করা হয় যে তারা নাকি সুবিধা নিতে আসে। অর্থাৎ, সরকার অভিবাসীদের প্রয়োজনকে ব্যবহার করছে, কিন্তু দায়ভার আবার তাদের ওপরই চাপিয়ে দিচ্ছে।

 

Reunite Families UK‑এর নীতি ও অ্যাডভোকেসি প্রধান মাত্তেও বেসানা বলেন যে এটি একটি জাতীয় কেলেঙ্কারি—হোম অফিসকে এতদিন ধরে অভিবাসন ফি থেকে বিপুল মুনাফা করতে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ভিসা ব্যবস্থা কার্যত একটি দ্বৈত কর আরোপের মতো, যেখানে একই পরিবারের সদস্যদের ওপর বারবার উচ্চ ফি চাপানো হয়। তার মতে, এই কাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয় এবং শিশুদেরও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে। তিনি বলেন, কোনো সরকারই এই ধরনের নীতিকে ন্যায্যতা দিতে পারে না, কারণ এটি মানবিক ও সামাজিক ন্যায়ের পরিপন্থী।

হোম অফিস বছরের পর বছর ধরে অভিবাসন ও ন্যাশনালিটি ফি নির্বিচারে এবং অসামঞ্জস্যভাবে বাড়িয়ে চলেছে। ফি বৃদ্ধির হার বাস্তব খরচের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি এমনভাবে বাড়ানো হচ্ছে যেন অভিবাসন ব্যবস্থা একটি জনসেবা নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক রাজস্ব সংগ্রহের যন্ত্র। এই ফি‑এর বিনিময়ে যে সেবা পাওয়া যায়, তা “ভ্যালু ফর মানি” ধারণার সঙ্গে মোটেও মেলে না—অভিবাসীরা উচ্চ ফি প্রদান করলেও সেবার মান, সময়সীমা বা প্রশাসনিক দক্ষতা কোনো ক্ষেত্রেই উন্নত হচ্ছে না।

হোম অফিস এই ফি বৃদ্ধির আগে কোনো ব্যবহারকারী পরামর্শ গ্রহণ করে না, কোনো জনমত সংগ্রহ করে না, কোনো আর্থিক প্রভাব মূল্যায়ন (financial impact assessment) প্রকাশ করে না, এবং কোনো স্টেকহোল্ডার রিভিউও করে না। অর্থাৎ, যারা এই ফি প্রদান করে—অভিবাসী পরিবার, কর্মী, শিক্ষার্থী, শরণার্থী—তাদের মতামত বা অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখে না। পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হয় যেন এটি কেবল অর্থ উপার্জনের একটি যন্ত্র, যেখানে মানবিক বিবেচনা, ন্যায়বিচার বা সামাজিক দায়িত্ববোধের কোনো স্থান নেই।

 

এই আচরণ ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রতিফলন—যেখানে ক্ষমতাসীন প্রতিষ্ঠান ফি‑প্রদানকারী অভিবাসীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করে বরং তাদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। অভিবাসীরা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, সমাজ ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও নীতিনির্ধারণে তাদের প্রতি সম্মান, স্বীকৃতি বা ন্যায্যতা প্রদর্শিত হয় না। বরং তাদেরকে এমনভাবে বিবেচনা করা হয় যেন তারা কেবল রাজস্বের উৎস।

ফলাফল হলো—অভিবাসীরা ক্রমাগত আর্থিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে পড়ে। পরিবারগুলোকে বারবার উচ্চ ফি দিতে হয়; অনেক সময় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্য একই ধরনের ফি পুনরায় দিতে হয়। এই কাঠামো মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়, পরিকল্পনা নষ্ট করে, এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বৈষম্য বাড়ায়।

সারসংক্ষেপে, হোম অফিসের বর্তমান ফি‑নীতি মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি অভিবাসীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না; বরং তাদের আর্থিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করে একটি রাজস্ব‑নির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রশাসনের মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

আরো পড়ুন

রাশিয়ান কূটনীতিককে যুক্তরাজ্য হতে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রসচিব

এমপি অ্যামেস হত্যায় অভিযুক্ত যুবক আটক

আজ লন্ডনের কিংস ক্রস স্টেশনে জরুরি পরিস্থিতিঃ মুহূর্তের আতঙ্ক, যাত্রীদের দুর্ভোগ