TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকযুক্তরাজ্য (UK)

ইইউর ‘মেড ইন ইউরোপ’ আইনে যুক্তরাজ্যকে বাদ দিতে চায় ফ্রান্সঃ বাড়ছে ইউরোপে মতভেদ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রস্তাবিত ‘মেড ইন ইউরোপ’ নীতিতে যুক্তরাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ফ্রান্স। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য কম-কার্বন প্রযুক্তি সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইইউর সদস্য দেশগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।

প্রস্তাবিত নীতির আনুষ্ঠানিক নাম ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্ট’। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো চীনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিনির্ভর প্রতিযোগিতার মোকাবিলা করা এবং ইউরোপীয় শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। প্রস্তাব অনুযায়ী নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি অর্থ, ভর্তুকি ও সরকারি ক্রয়ে ইউরোপে উৎপাদিত পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতে পারে।

তবে ‘মেড ইন ইউরোপ’ বলতে ঠিক কোন কোন দেশকে বোঝানো হবে, সেটিই এখন বড় বিতর্কের বিষয়। যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি কানাডা ও জাপানের মতো ইইউর ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদারদেরও এই নীতির আওতায় রাখা হবে কি না, তা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।

বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইইউর শিল্পমন্ত্রীদের বৈঠকে ফ্রান্স অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ সংজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নেয়। ফরাসি শিল্পমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন মার্টিন বলেন, ইউরোপীয় করদাতাদের অর্থ ইউরোপীয় কর্মী ও কারখানাগুলোকে সহায়তা করা উচিত। যুক্তরাজ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশটি কয়েক বছর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য বা নির্দিষ্ট খাতে চুক্তি করা যাবে না।

ফ্রান্সের ইউরোপ বিষয়ক মন্ত্রী বেঞ্জামিন হাদাদও যুক্তরাজ্যকে একই ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি ইইউর একক বাজারের অংশ না হয় এবং সেই বাজারের আর্থিক সক্ষমতায় অবদান না রাখে, তাহলে তাকে একই ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার প্রশ্নে আলাদা বিবেচনা থাকতে পারে।

তবে জার্মানির অবস্থান ভিন্ন। দেশটি ‘মেড ইন ইউরোপ’-এর পরিবর্তে আরও বিস্তৃত ‘মেড উইথ ইউরোপ’ ধারণার পক্ষে, যেখানে যুক্তরাজ্যসহ ইইউর ঘনিষ্ঠ অংশীদারদের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। জার্মান অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রী ক্যাথারিনা রাইশে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন হলেও বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে ইউরোপকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত নয়। পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে অংশীদার দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষেও তিনি মত দেন।

জার্মানির এই অবস্থানকে নর্ডিক দেশগুলোর কয়েকটি দেশও সমর্থন করছে। সুইডেনের উপপ্রধানমন্ত্রী এব্বা বুশ বলেন, ইউরোপের কিছু দেশ ইইউর সদস্য না হলেও ইউরোপীয় বাজার সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তাদের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

এই বিতর্ক যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্ক পুনর্গঠনের আলোচনাতেও প্রভাব ফেলছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের কাছে ‘মেড ইন ইউরোপ’ নীতিতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান এখন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই আইন নিয়ে আলোচনা না হলে যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্ক পুনর্গঠনের পরবর্তী শীর্ষ বৈঠকের সময়সূচি নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাজ্যের পণ্যকে ইউরোপীয় পণ্য হিসেবে গণ্য না করা হলে ইউরোপের বড় সরকারি চুক্তি ও শিল্প প্রকল্পে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো সুযোগ হারাতে পারে।

তবে ইইউর পক্ষ থেকে এখনো যুক্তরাজ্যকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক উন্নয়নমন্ত্রী মিখাল বারানোভস্কি বলেছেন, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলো এখনো আলোচনার মধ্যে রয়েছে। আইন চূড়ান্ত হওয়ার সময় যুক্তরাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার কথা।

ইইউর মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা সমন্বয়কারী আয়ারল্যান্ডও জানিয়েছে, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্ট’ এবং ইউরোপীয় অগ্রাধিকার নীতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। আয়ারল্যান্ড ডিসেম্বরের মধ্যে ইইউ কাউন্সিল ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতার আশা করছে।

যুক্তরাজ্য সরকার অবশ্য জানিয়েছে, তারা ইইউর ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ইউরোপীয় অংশীদার হিসেবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী। ‘মেড ইন ইউরোপ’ নীতি নিয়েও ইইউর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে লন্ডন।

ফলে ‘মেড ইন ইউরোপ’ নীতির চূড়ান্ত রূপ এখনো নির্ধারিত না হলেও যুক্তরাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে ফ্রান্স ও জার্মানির ভিন্ন অবস্থান ইইউর অভ্যন্তরীণ আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য-ইইউ অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এমকে

আরো পড়ুন

লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের মালিকানা কিনছে সৌদি

মালয়েশিয়ায় কেএফসির সব আউটলেট বন্ধ

তিন বছরের নাগরিকত্বের সুযোগ শেষ, কঠোর অভিবাসন নীতির পথে জার্মানি