12.9 C
London
October 19, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

ইউনান থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত স্থলপথের সম্ভাবনাঃ আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্থলপথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে উঠলে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে বাংলাদেশ শুধু আমদানি-রপ্তানির দেশ হিসেবে নয়, আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটনের ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি ড. মাহরুফ চৌধুরী চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কৌশলগত গুরুত্ব এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন। তার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শুধু সড়ক বা রেলপথ নির্মাণ যথেষ্ট নয়; বন্দর, কাস্টমস, শিল্পায়ন, গুদামজাতকরণ, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।

চীনের ইউনান প্রদেশ সমুদ্র উপকূল থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে দেশটির উপকূলীয় বন্দরগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এই নির্ভরতা কমানো, পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির লক্ষ্যে দক্ষিণমুখী যোগাযোগ চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন এবং অর্থনৈতিক করিডোর এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত কিয়াউকফিউ বন্দর চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করা গেলে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের নতুন পথ গড়ে উঠতে পারে। তবে এই স্থলপথ এখনো একটি সম্ভাব্য সংযোগ পরিকল্পনা; এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অবকাঠামো, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমঝোতার ওপর।

সম্ভাব্য এই করিডোরের একটি রুট হতে পারে চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের ম্যান্ডালে, এরপর দেশটির পশ্চিমাঞ্চল ও রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত। এই পথে কার্যকর সড়ক ও রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ পেতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশের শিল্প ও কৃষিপণ্যও স্থলপথে চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ পেতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানি বর্তমানে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। এসব বাজার গুরুত্বপূর্ণ হলেও নতুন বাজার তৈরি করা অর্থনীতির ঝুঁকি কমানোর একটি উপায়। চীন, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ গড়ে উঠলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দাম, পণ্যের মান, শুল্কনীতি ও বাণিজ্যিক চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

করিডোরটি কার্যকর হলে চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। বন্দরটি শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে। এতে ট্রানজিট ফি ছাড়াও গুদামজাতকরণ, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, প্যাকেজিং, বিমা, ব্যাংকিং, পরিবহন ও বন্দরসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবা থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগাতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্য খালাসের সময় কমানো, আধুনিক গুদাম নির্মাণ এবং সড়ক, রেল ও নৌপথের মধ্যে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সিঙ্গাপুর, দুবাই ও নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা দেখায়, ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যবান্ধব নীতির প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

করিডোরের সম্ভাব্য প্রভাব দেশের পূর্বাঞ্চলের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, পর্যটন, বাণিজ্যিক সেবা ও শিল্প উৎপাদনের নতুন কার্যক্রম গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিকতার বাইরে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের বিস্তার ঘটতে পারে।

তবে শুধু পণ্য চলাচলের পথ তৈরি করলেই বাংলাদেশ সমানভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে না। করিডোরের সঙ্গে দেশীয় শিল্প, প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে যুক্ত করতে না পারলে বাংলাদেশ মূলত অন্য দেশের পণ্য পরিবহনের ভূখণ্ডে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। তাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ট্রানজিট রাজস্ব অর্জন নয়; বরং রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন শিল্প স্থাপন, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং পণ্যে মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করা।

করিডোর বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি। দেশটির চলমান সংঘাত, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং রাখাইন অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সড়ক ও রেল যোগাযোগ নির্মাণ এবং তা নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থও বিবেচনায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের তাই সম্ভাব্য রুটগুলোর অর্থনৈতিক ও কারিগরি সমীক্ষা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং বিকল্প যোগাযোগপথ নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের অন্যান্য পরিবহন অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা এবং দ্রুত পণ্য খালাসের জন্য ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূল হলে যাতে বাংলাদেশ প্রস্তুত থাকে, সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি অনিশ্চয়তার কারণে অতিরিক্ত আর্থিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি এড়ানোর ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর বাংলাদেশের সামনে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সংযোগ সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক সমঝোতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর। পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে এই সংযোগ ভবিষ্যতে নতুন বাজার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য মূল বিষয় হবে, সম্ভাব্য এই করিডোরের সুফল কতটা দেশের শিল্প, রপ্তানি ও মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়।

সূত্রঃ এডিবি

এমকে

আরো পড়ুন

মন্ত্রিসভার শপথ সংসদের খোলা আকাশের নিচে

দেশে প্রথমবারের মতো মানবদেহে ‘ব্যাট-রিওভাইরাস’ সনাক্ত

ডাকসু নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনাঃ সরকার, বিএনপি ও জামায়াতের টেলিফোন সংলাপ