বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন শুধু একটি আর্থিক সূচক নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং বহিঃখাতের স্থিতিশীলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। কয়েক বছর আগেও রিজার্ভ ছিল দেশের অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক। কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয়ের উল্লম্ফন, ডলার সংকট এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতার কারণে সেই রিজার্ভ দ্রুত কমে যায়। এখন সেই অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।
এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। লক্ষ্যটি অর্জিত হলে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হবে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই লক্ষ্য অর্জনের পথ মোটেও সহজ নয়। কারণ রিজার্ভ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির গতিও ধরে রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট। সেদিন মোট (গ্রস) রিজার্ভ দাঁড়িয়েছিল ৪৮ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার।
করোনা মহামারির সময় আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একইসময়ে প্রবাসী আয় রেকর্ড মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। ফলে রিজার্ভ দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে।
কিন্তু মহামারির পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যায়। একই সময়ে রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে অস্থিরতা দেখা দেয়। ফলে কয়েক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এখন সরকার সেই পুরোনো রেকর্ড ছাড়িয়ে ৫১ বিলিয়ন ডলারের নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে চায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট-পূর্ব পূর্বাভাস অনুযায়ী, রফতানি আয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ, ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরে রিজার্ভ ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগোতে পারে।
বাংলাদেশে রিজার্ভ নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় হিসাব পদ্ধতির পার্থক্যকে কেন্দ্র করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যে গ্রস রিজার্ভ প্রকাশ করে, সেখানে নগদ বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণ, বৈদেশিক বন্ড, ট্রেজারি বিল, আইএমএফের স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর), এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) এবং অন্যান্য কিছু সম্পদও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিএপিএম-৬ (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস ম্যানুয়াল-৬) পদ্ধতিতে রিজার্ভ হিসাব করে। এই পদ্ধতিতে শুধু সহজে ব্যবহারযোগ্য ও তরল বৈদেশিক সম্পদকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে দুই হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হয়।
সর্বশেষ ২৩ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আইএমএফের বিএপিএম-৬ পদ্ধতিতে একই সময়ের রিজার্ভ ছিল মাত্র ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সরকারের ৫১ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভের হিসাব অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে অর্থনীতির সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো—রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী উত্থান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ২৩ দিনেই দেশে প্রায় ২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২৩ মে একদিনেই দেশে এসেছে ১৭৩ দশমিক ৬৪ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে ২৩ মে পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। ফলে প্রায় ১১ মাসে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো সহজ হওয়া এবং বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার বৃদ্ধি—এই চারটি কারণে রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির পেছনে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮৯ হাজার ৮৭০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৮৫ হাজার ৩৪০ জন।
নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশে কর্মী নিয়োগ বাড়ায় আগামী বছরগুলোতেও রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকার আশা করা হচ্ছে।
একসময় বাজারে ডলার সংকট সামাল দিতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে। এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।
২৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা বিনিময় হারে ৬ কোটি ডলার কিনেছে। শুধু মে মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ডলার ক্রয় দাঁড়িয়েছে ৬২৫ মিলিয়ন ডলার। আর চলতি অর্থবছরে মোট ডলার ক্রয়ের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার অর্থ হচ্ছে বাজারে ডলারের সরবরাহ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অতিরিক্ত ডলার সংগ্রহ করে রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—রিজার্ভ বাড়বে নাকি বিনিয়োগ? রিজার্ভ বৃদ্ধির লক্ষ্যকে স্বাগত জানালেও অর্থনীতিবিদরা একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলছেন।
তাদের মতে, অর্থনীতি কি শুধু রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য পরিচালিত হবে, নাকি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে?
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, রিজার্ভ বাড়াতে হলে রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ শক্তিশালী রাখতে হবে। কিন্তু একই সময়ে যদি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাড়ানো হয়, তাহলে মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিও বাড়বে। আর আমদানি বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়বে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে।
অর্থাৎ সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে রফতানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ অবস্থায় বহিঃখাতের সামগ্রিক চিত্রকে পুরোপুরি শক্তিশালী বলা যাচ্ছে না।
রফতানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে রিজার্ভ ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার আমদানি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, রফতানি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ এবং রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ ধরা হয়েছে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে। বিদ্যমান ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির পরিবর্তে ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে।
চুক্তি সম্পন্ন হলে আগামী অর্থবছরে আইএমএফ থেকে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাজেট সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার সহায়তা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব অর্থ সরাসরি রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে একইসঙ্গে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ ও সুদের চাপও বাড়াবে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির পথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে রফতানি আয় কমে যেতে পারে। শ্রমবাজার সংকুচিত হলে রেমিট্যান্সে ধাক্কা লাগতে পারে।
অন্যদিকে অর্থনীতি চাঙা হলে বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন বাড়বে, যার ফলে আমদানি ব্যয়ও দ্রুত বাড়তে পারে। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণের ওপর অতি নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতির বাস্তবতা হলো, শুধু বড় অঙ্কের রিজার্ভ থাকলেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রফতানি সক্ষমতা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর। বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনীতিকে নতুন করে গতি দিতে হচ্ছে।
তাই আগামী অর্থবছরে ৫১ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ অর্জনের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী এবং ইতিবাচক। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের গতি ধরে রাখা আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
রেমিট্যান্স, রফতানি, বৈদেশিক সহায়তা এবং নতুন বিনিয়োগ—এই চারটি খাত একসঙ্গে শক্তিশালী থাকলে বাংলাদেশ শুধু রিজার্ভের নতুন রেকর্ডই গড়বে না, বরং আরও টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তিও তৈরি করতে পারবে।
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন
এম.কে

