কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ছয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় সামনে এসেছে হৃদয়বিদারক তথ্য। আগুন থেকে বাঁচতে বাথরুমে আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি পরিবারের চার সদস্যের। উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আগুনের মধ্যে বাথরুমে আটকা পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেলিতা মেহেজাবিন আলভি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা।
উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর প্রাণ বাঁচাতে পরিবারের চার সদস্য বাথরুমে আশ্রয় নেন। আগুনের তাপ থেকে রক্ষা পেতে তারা নিজেদের শরীর ও আশপাশের জায়গায় পানি ঢালছিলেন বলে জানা গেছে। কিন্তু ঘন ধোঁয়ার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান। বাথরুমের ভেতরে একে অপরকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।
পরিবারটির জন্য এই ভ্রমণ ছিল আনন্দের আয়োজন। তিন দিনের কক্সবাজার সফর শেষে তাদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড সেই আনন্দযাত্রাকে পরিণত করে শোকাবহ ঘটনায়।
নিহতদের স্বজন আমিনুল ইসলাম খবর পেয়ে ঢাকা থেকে বিমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে পৌঁছে স্বজনদের হারানোর শোকে ভেঙে পড়েন তিনি।
সাংবাদিকদের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমার ভাগনে-ভাগনি মারা গেছে। আমার তিন বোন। আমি একমাত্র ভাই। সেই তিন বোনেরই পাঁচ ছেলে-মেয়ে মারা গেছে। বড় ভাগনির বাচ্চাটাও মারা গেছে। ওরা নয়জন বেড়াতে এসেছিল। বেঁচে আছে মাত্র তিনজন।”
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আগুন লাগার পর রিসোর্টের কর্মীরা পর্যটকদের বিপদের মধ্যে রেখে সরে যান। এ ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিসোর্টটি সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে নির্মিত তিনতলা স্থাপনা বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। গত জুনে রিসোর্টটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হলেও সেখানে ব্যবসা চালু ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
ঘটনাটি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অনুমোদনহীন স্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মেরিন ড্রাইভ ও আশপাশের পর্যটন এলাকায় হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি নির্গমনপথ এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
একটি পর্যটনকেন্দ্রের রিসোর্টে আগুন লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েও চারজনের মৃত্যু এবং একই পরিবারের ছয়জনকে হারানোর ঘটনা শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি পর্যটন স্থাপনার নিরাপত্তা তদারকি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্রঃ টিবিএস
এমকে

