ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সাবেক লেবার পার্টি নেতা ও বর্তমান ‘ইওর পার্টি’র সংসদীয় নেতা জেরেমি করবিন। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রিটেনের সব ধরনের সামরিক সহযোগিতা বন্ধ, অস্ত্র সরবরাহ পুরোপুরি স্থগিত এবং ইসরায়েলকে সহায়তা করে এমন সামরিক অবকাঠামোর ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে করবিন বলেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে হলে আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করার পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রিটেনের সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তিনি যুদ্ধের অবসান এবং ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য শান্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা জানান।
করবিনের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ বসতিগুলো থেকে উৎপাদিত সব পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। ব্রিটিশ সরকার এটিকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। করবিন অবশ্য বলেছেন, বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ করা স্বাগত পদক্ষেপ হলেও এটি যথেষ্ট নয়। তার মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বন্ধ না করলে ব্রিটেনের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে না।
করবিন স্পষ্ট ভাষায় ব্রিটেনের প্রতি সব ধরনের অস্ত্র বিক্রি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা এবং এমন সব সহায়তা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন, যা তার ভাষায় ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও গাজায় চলমান যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে।
ব্রিটেনের সামরিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি। যুক্তরাজ্য এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ উৎপাদনে যুক্ত এবং বৈশ্বিক এফ-৩৫ কর্মসূচির মাধ্যমে ইসরায়েলও এসব সরঞ্জামের সুবিধা পেয়ে থাকে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য এর আগে ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র রপ্তানির কিছু লাইসেন্স স্থগিত করলেও এফ-৩৫ কর্মসূচির আওতাভুক্ত সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
এলবিট সিস্টেমসের মতো ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্রিটিশ সামরিক সহযোগিতাও করবিনের সমালোচনার আওতায় এসেছে। তিনি এমন সব প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যেগুলো ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
যুক্তরাজ্য অবশ্য ইসরায়েলের সঙ্গে তার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার অবস্থান নেয়নি। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। ইরানের হুমকির মতো বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে।
তবে একই সময়ে লন্ডনের নীতিতে পরিবর্তনও স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাজ্য গত বছর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর এবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে সব পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে এটিকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে ব্রিটিশ নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
করবিনের রাজনৈতিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত লেবার পার্টির নেতা এবং ব্রিটিশ বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ২০২০ সালে লেবার পার্টির সংসদীয় দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তিনি দীর্ঘ সময় স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১০ জুন ২০২৬ থেকে তিনি ‘ইওর পার্টি’র সংসদীয় দলভুক্ত এবং বর্তমানে ওই দলের সংসদীয় নেতা। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সরকারি তথ্যেও তার বর্তমান দল হিসেবে ‘ইওর পার্টি’ উল্লেখ রয়েছে।
ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কারণে করবিন সম্প্রতি ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া ১২ জন ব্রিটিশ এমপির একজন হয়েছেন। ইসরায়েল তাদের বিরুদ্ধে ‘ইসরায়েলবিরোধী কর্মকাণ্ড’ ও ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলেছে। করবিন অবশ্য ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও শান্তির পক্ষে তার অবস্থান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়েও করবিন দীর্ঘদিন ধরে সরব। ২০২৬ সালের মার্চে তার নেতৃত্বে গঠিত ‘গাজা ট্রাইব্যুনাল’ যুক্তরাজ্যের ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তোলে এবং ব্রিটেনকে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বন্ধ করার সুপারিশ করে। ব্রিটিশ সরকার অবশ্য ওই ট্রাইব্যুনালের অভিযোগগুলো গ্রহণ করেনি।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্রিটেন একদিকে অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, অন্যদিকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বজায় রাখছে। করবিনের দাবি এই নীতির আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রিটেনের সামরিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা। ফলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ব্রিটিশ সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
সূত্রঃ আল জাজিরা
এম.কে

