যুক্তরাজ্যের কারাগারে থাকা গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত আলবেনীয় নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে ২০২৩ সালে নেওয়া ৮ মিলিয়ন পাউন্ডের উদ্যোগ বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। ২০০ জন আলবেনীয় বন্দিকে নিজ দেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ জনকে আলবেনিয়ায় স্থানান্তর করা হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্য প্রকল্পটির গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২০২৩ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্য ও আলবেনিয়া নতুন একটি বন্দি স্থানান্তর ব্যবস্থায় সম্মত হয়। এর আওতায় যুক্তরাজ্যে চার বছর বা তার বেশি মেয়াদের সাজা পাওয়া সর্বোচ্চ ২০০ জন আলবেনীয় নাগরিককে তাদের বাকি সাজা নিজ দেশে ভোগের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। একই সঙ্গে আলবেনিয়ার কারাগার আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে ব্রিটিশ সরকারের আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়।
উদ্যোগটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল একদিকে যুক্তরাজ্যের কারাগারে বন্দির চাপ কমানো, অন্যদিকে বিদেশি অপরাধীদের নিজ দেশে সাজা ভোগের ব্যবস্থা করে করদাতাদের ব্যয় কমানো। ব্রিটিশ সরকারও তখন জানিয়েছিল, আলবেনিয়ায় বন্দি রাখার খরচ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের তুলনায় কম হওয়ায় এই ব্যবস্থা সরকারি অর্থ সাশ্রয়ে সহায়ক হবে।
কিন্তু তিন বছর পর প্রকল্পের বাস্তব চিত্র প্রত্যাশার সঙ্গে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখাচ্ছে। আলবেনিয়ার বিচার মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০ বন্দিকে স্থানান্তরের লক্ষ্য থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে।
এর আগে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া তথ্যেও স্থানান্তর প্রক্রিয়ার ধীরগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে পার্লামেন্টে জানানো হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈধভাবে যাচাই করা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মাত্র চারজন আলবেনীয় বন্দিকে দ্বিপাক্ষিক বন্দি স্থানান্তর চুক্তির আওতায় আলবেনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে আরও পুরোনো বন্দি স্থানান্তর চুক্তি। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্য ও আলবেনিয়া সংশোধিত বাধ্যতামূলক বন্দি স্থানান্তর চুক্তি করে, যা ২০২২ সালের মে মাসে কার্যকর হয়। ২০২৩ সালের নতুন ব্যবস্থা মূলত ওই চুক্তিকে আরও কার্যকর করে বড় সংখ্যক গুরুতর অপরাধীকে আলবেনিয়ায় পাঠানোর পথ তৈরি করার উদ্যোগ ছিল।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আলবেনিয়ার কারাগার ব্যবস্থায় ব্রিটিশ আর্থিক সহায়তা। যুক্তরাজ্য আলবেনিয়ার কারাগার আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় ৮ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তার পরিকল্পনা করে। ব্রিটিশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে আলবেনিয়ায় বন্দিদের রাখার ব্যবস্থা তৈরি করা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কারাগারে জায়গা খালি করা সম্ভব হওয়ার কথা ছিল।
তবে বন্দি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে শুধু দুই সরকারের রাজনৈতিক সম্মতিই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট বন্দির সাজা, আইনি নথিপত্র এবং স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দুই দেশের কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। ২০২৬ সালের মার্চে ব্রিটিশ সরকার পার্লামেন্টকে জানিয়েছে, আলবেনিয়ার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাধ্যতামূলক বন্দি স্থানান্তর চুক্তি রয়েছে এবং বন্দির সম্মতি প্রয়োজন না হলেও স্থানান্তরের জন্য দুই রাষ্ট্রের সম্মতি প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্থানান্তরের ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে আলবেনিয়ার আদালত ব্যবস্থায় মামলার জটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশ আদালতে দেওয়া সাজা আলবেনিয়ার আইনি ব্যবস্থায় স্বীকৃত হওয়ার পরই অনেক ক্ষেত্রে বন্দিকে সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। ফলে প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা পুরো প্রকল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের কারাগারে বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা এবং কারাগারের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চাপ রয়েছে। আলবেনীয় নাগরিকরা ব্রিটিশ কারাগারে থাকা বিদেশি বন্দিদের অন্যতম বৃহৎ গোষ্ঠী। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রায় ৯৪০ জন আলবেনীয় বন্দির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বন্দি স্থানান্তর প্রকল্পের ধীরগতি সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার বলছে, বিদেশি অপরাধীদের যুক্তরাজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এটি একমাত্র ব্যবস্থা নয়। ২০২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলস থেকে ১ হাজার ৬১০ জন আলবেনীয় বিদেশি অপরাধীকে অপসারণ করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে মোট ১১ হাজার ৭০০-এর বেশি বিদেশি অপরাধীকে যুক্তরাজ্য থেকে সরানো হয়েছে। সরকারের দাবি, বন্দি স্থানান্তর চুক্তি দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বিদেশি অপরাধীদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে, তবে বিদেশি অপরাধীদের অপসারণে অন্যান্য ব্যবস্থাও একই সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ফলে ২০০ জন গুরুতর অপরাধীকে আলবেনিয়ায় পাঠানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩ জনের স্থানান্তরে সীমাবদ্ধ থাকায় প্রশ্ন উঠছে—৮ মিলিয়ন পাউন্ডের এই বিনিয়োগের সুফল কতটা দ্রুত পাওয়া যাবে এবং বাকি বন্দিদের স্থানান্তর করতে ব্রিটিশ ও আলবেনীয় কর্তৃপক্ষ আর কত সময় নেবে। চুক্তিটির মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাজ্যের কারাগারের ওপর চাপ কমানো ও করদাতাদের অর্থ সাশ্রয় করা; কিন্তু বর্তমান অগ্রগতি সেই লক্ষ্য পূরণ থেকে এখনও অনেক দূরে।
সূত্রঃ দ্য সান
এম.কে

