TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্য ভাঙার লক্ষ্যে বৈঠকে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা

স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাপন্থী নেতারা যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। সোমবার ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে অনুষ্ঠেয় এই সম্মেলনে তিন দেশের সরকারপ্রধানরা একটি যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করবেন বলে জানিয়েছে দ্য টেলিগ্রাফ।
কার্ডিফের এই বৈঠকে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে যৌথ অবস্থান তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে স্বাধীনতা নিয়ে গণভোট আয়োজনের অধিকার দাবি করা হবে।
বৈঠকটি এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার পক্ষে ‘স্পষ্ট ঐকমত্য’ তৈরি হলে আরেকটি গণভোটের সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও উত্তর আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করেছেন। শনিবার ডাবলিন সফরের সময় তিনি বলেন, উত্তর আয়ারল্যান্ড আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হলে তা ‘দারুণ বিষয়’ হবে এবং এমন পরিবর্তন কীভাবে খারাপ হতে পারে—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা ও স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সোয়িনি দাবি করেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড—তিন দেশেই এখন স্বাধীনতাপন্থী ফার্স্ট মিনিস্টার রয়েছেন।
সোয়িনি আরও বলেন, ওয়েস্টমিনস্টারকে যুক্তরাজ্য-পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম হয়তো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে ইতিহাসে তিনি যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত হতে পারেন।
মে মাসের নির্বাচনে ওয়েলসে লেবার পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্লেইড কামরু সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসে। দলটির নেতা রুন আপ আইওয়ার্থ মে মাসে ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্ব নেন।
স্কটল্যান্ডে ছয়টি হলিরুড আসন হারালেও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি এখনও প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। একই নির্বাচনে রিফর্ম পার্টি ও গ্রিন পার্টিও অগ্রগতি করেছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইন ২০২২ সালের স্টর্মন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়। তবে ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির বয়কটের কারণে মিশেল ও’নিল ২০২৪ সালে ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আগামী বছর উত্তর আয়ারল্যান্ডে আবার নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে এবং সিন ফেইন ক্ষমতা ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কার্ডিফের বৈঠকে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের তিন ফার্স্ট মিনিস্টারের পাশাপাশি সিন ফেইনের প্রেসিডেন্ট ও আয়ারল্যান্ডের ডেইলে বিরোধীদলীয় নেতা মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও অংশ নেবেন।
কার্ডিফ বে-র পাশে সেন্ট ডেভিডস হোটেলে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে আলোচনা হবে।
বৈঠকের পর তিন ফার্স্ট মিনিস্টার একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি সমঝোতা স্মারকেও স্বাক্ষর করার কথা রয়েছে।
সমঝোতা স্মারকে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। তিন দলই তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পক্ষে অবস্থান নেবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে নতুন সদস্য হওয়ার এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার অবস্থান তুলে ধরবে।
অর্থনৈতিক বিষয়ে তিন দলের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ তুলে ধরা হবে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণের স্বার্থ যথাযথভাবে পূরণ করছে না।
ওয়েলসের প্লেইড কামরু সরকারকে কর ও সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও ক্ষমতা দেওয়ার দাবি তুলবে। দলটি ক্রাউন এস্টেট থেকে পাওয়া রাজস্বের অংশ ওয়েলসকে দেওয়ারও দাবি করছে। এর মধ্যে সমুদ্রতল থেকে পাওয়া আয়ও রয়েছে, যেখানে সমুদ্রভিত্তিক বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়।
প্লেইড কামরু আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের লক্ষ্যে বার্নেট ফর্মুলা পরিবর্তনের পাশাপাশি পুলিশিং ও রেল খাতে অর্থায়নের মতো আরও কিছু ক্ষমতা ওয়েলস সরকারের হাতে হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছে।
প্লেইড কামরুর একটি সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি, অর্থনীতি, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তিন দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। অভিন্ন স্বার্থে অংশীদার ও সমান মর্যাদার ভিত্তিতে কাজ করার ওপরও দলটি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সিন ফেইনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিটি দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। দলটি গুড ফ্রাইডে চুক্তিকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে তুলে ধরেছে।
সিন ফেইনের একটি সূত্রের ভাষ্য, আইরিশ ঐক্য কোনো দূরের আকাঙ্ক্ষা নয় এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
তবে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা গণভোট নিয়ে তার সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন। বৃহস্পতিবার জন সোয়নিকে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি বলেন, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে স্কটল্যান্ডে আরেকটি স্বাধীনতা গণভোটের বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ নেই।
বার্নহাম বলেন, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার গণভোটের পক্ষে বর্তমানে কোনো ঐকমত্য নেই। একইভাবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বর্তমানে যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হয়ে যেতে চান—এমন স্পষ্ট ভিত্তিও নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে লেবার পার্টির অবস্থান ছিল পরিষ্কার—দলটি স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা বা আরেকটি গণভোটকে সমর্থন করে না।
বার্নহামের মতে, স্বাধীনতা ও গণভোটের প্রশ্ন সরকারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো অগ্রাধিকার থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে।
এদিকে, সোয়িনির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে দাবি করেছে, বার্নহাম যুক্তরাজ্যের ইউনিয়ন কাঠামো নিয়ে সরকারের অবস্থানের মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বুঝতে পারেননি।
কার্ডিফের বৈঠককে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্বাধীনতার দাবি এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের সম্ভাব্য আইরিশ ঐক্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যের মোটরওয়েতে বাড়ছে ভয়ঙ্কর দূর্ঘটনা

পূর্ব লন্ডনে ডাবল ডেকার দুর্ঘটনায় শিশুসহ ১৯ জনের বেশি আহত

অনলাইন ডেস্ক

ব্রেক্সিট ব্যর্থতার পর নতুন পথঃ ইইউর সঙ্গে যুব মোবিলিটি স্কিমে এগোচ্ছে যুক্তরাজ্য