বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে পরবর্তী প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে গড়ে তোলার আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে বছরে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে এ খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের পেছনে যেমন ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে দক্ষ জনবল তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও মানবসম্পদ, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে এখন থেকেই পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে।
ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৭৯ সালে দেশ গার্মেন্টস দক্ষিণ কোরিয়ার দাইউ কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ১৩০ জন তরুণ প্রকৌশলী ও কর্মীকে প্রশিক্ষণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠায়। পরবর্তীতে তারাই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে এ শিল্প থেকে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উচ্চ মূল্যসংযোজন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে প্রবেশের বিকল্প নেই। সেই প্রেক্ষাপটে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে দেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের মূল্য ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে এ শিল্পে তাইওয়ান বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদন ও সরবরাহকারী দেশ হিসেবে অবস্থান করছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত, তার সময় বা পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কোনো পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। এসব বিষয় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর গবেষকদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে চিপ ডিজাইনের সাফল্য দেশীয় প্রযুক্তি সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচনায় এসেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের গবেষণাকে শিল্প পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে আধুনিক ক্লিনরুম, উন্নত পরীক্ষাগার, গবেষণা তহবিল এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য।
তাদের মতে, শুধু চিপ ডিজাইন নয়; ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স, ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মাইক্রোফ্যাব্রিকেশন, প্যাকেজিং এবং টেস্টিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বর্তমান রপ্তানি সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এ জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) ধারাবাহিক বিনিয়োগ, বিদেশি প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং শক্তিশালী শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তারা আরও মনে করেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সফল হতে পারলে বাংলাদেশ উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানি অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা এবং বৈশ্বিক বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। এ খাতকে ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি, বেসরকারি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান শর্ত।
সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া
এম.কে

