জুলাই চার্টারকে ঘিরে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এটিকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করেন, সেটিই পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কমিশনের প্রণীত ‘জুলাই চার্টার’ ছিল একটি বিস্তৃত সংস্কারপ্যাকেজ, যেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন থেকে শুরু করে নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, দুর্নীতি দমন এবং অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন —সব মিলিয়ে ৮০টিরও বেশি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০২৫ সালের গণভোটে চার্টারের প্রতি জনসমর্থন নিশ্চিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির আদেশে একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের পথ তৈরি হয়। কিন্তু এখানেই শুরু হয় সাংবিধানিক বিতর্ক। বর্তমান সংবিধানে এ ধরনের পরিষদের কোনো স্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই, ফলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গণভোট রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন দীর্ঘমেয়াদে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন সতর্কতা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বারবার উঠে এসেছে।
এদিকে বিএনপি শুরু থেকেই জুলাই চার্টারের বেশ কিছু প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাদের দ্বিমত ও নোট অব ডিসেন্ট কমিশনের কাছে জমা দিয়েছিল। দলটির অভিযোগ, তাদের আপত্তি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং কমিশন মূলত একতরফাভাবে চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরি করেছে। ফলে নির্বাচিত সংসদে চার্টার নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও বিএনপি এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা মনে করে, চার্টারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র বৈধ প্ল্যাটফর্ম হলো সংসদ, যেখানে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা যেতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি রাজনৈতিক কারণে এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, চার্টার ও সংস্কার পরিষদ—উভয়ই বিতর্কিত এবং সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে সংসদে আলোচনার শুরু থেকেই উত্তেজনা, প্রতিবাদ ও অচলাবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংসদে দুই ধরনের সদস্য—নির্বাচিত ও অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে শপথ নেওয়া—এই বিভাজনও ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের জন্ম দিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে জুলাই চার্টার এখন কেবল একটি সংস্কারপ্যাকেজ নয়; এটি রাজনৈতিক বৈধতা, সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য—এই তিনটি প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে। চার্টার বাস্তবায়ন হবে কি না, হলে কোন কাঠামোর মাধ্যমে হবে, এবং নির্বাচিত সরকার কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জুলাই চার্টার বর্তমান সংকটের উৎস এবং সমাধান—দুই সম্ভাবনাই ধারণ করে। এটি একদিকে রাজনৈতিক রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে সাংবিধানিক বিতর্ক ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করেছে। আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করবে চার্টারকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত এই জটিলতা কীভাবে সমাধান করা হয় তার ওপর।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক নকশা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে—এমন ধারণা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ক্ষমতাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি যে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করেন, সেটিই পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কেন্দ্রীয় কাঠামো হিসেবে আবির্ভূত হয়। কমিশনের প্রণীত ‘জুলাই চার্টার’-এ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতি দমন এবং অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার উন্নয়নসহ ৮০টিরও বেশি সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০২৫ সালের গণভোটে এসব প্রস্তাবের প্রতি জনসমর্থন নিশ্চিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির নির্দেশে একটি সংস্কার পরিষদ গঠনের পথ তৈরি হয়। তবে সংবিধানে এ ধরনের পরিষদের কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি না থাকায় এর বৈধতা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক দেখা দেয়। গণভোটের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা দীর্ঘমেয়াদে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে—এমন সতর্কতা বারবার উঠে এসেছে।
নির্বাচিত রাজনৈতিক দলগুলো যদি এই সংস্কার পরিষদে অংশগ্রহণ না করে, তবে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়া অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে একদিকে জনরায়ের প্রতি অবজ্ঞার অভিযোগ উঠতে পারে, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য রাজপথে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক বৈধতা ও অংশগ্রহণের সংকটে পড়তে পারে।
ইতোমধ্যেই জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি শপথ নেওয়ায় সংসদে দুই ধরনের সদস্যের উপস্থিতি দেখা দিয়েছে—একদল নির্বাচিত প্রতিনিধি, অন্যদল অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে শপথ নেওয়া সদস্য। এই দ্বৈত কাঠামো ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের জন্ম দিতে পারে এবং নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার, সংসদের বৈধতা ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। সমালোচকদের ধারণা, ড. ইউনূস এমন একটি জটিল ও ভঙ্গুর কাঠামো রেখে গেছেন যা নতুন নির্বাচিত সরকারকে শুরু থেকেই দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করবে।
বিএনপি শুরু থেকেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত ‘জুলাই চার্টার’-এর বেশ কয়েকটি প্রস্তাবের বিষয়ে তাদের দ্বিমত ও আনুষ্ঠানিক নোট অব ডিসেন্ট কমিশনের কাছে জমা দিয়েছিল। দলটির দাবি ছিল, চার্টারের কিছু অংশ সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে বিএনপির এই আপত্তি ও নোট অব ডিসেন্ট কমিশন মূলত উপেক্ষা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিএনপির উত্থাপিত উদ্বেগগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি—ফলে দলটি মনে করছে, তাদের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্টভাবে জানানো হলেও তা কার্যত বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
এই উপেক্ষা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ককে আরও জটিল করতে পারে। কারণ, একটি জাতীয় পর্যায়ের সংস্কার নথি যদি প্রধান রাজনৈতিক দলের আপত্তি উপেক্ষা করে প্রণীত হয়, তবে তার গ্রহণযোগ্যতা ও বাস্তবায়ন—উভয়ই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ফলে জুলাই চার্টার নিয়ে বিএনপির অবস্থান শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়; বরং এটি একটি প্রক্রিয়াগত ও নীতিগত আপত্তি, যা তারা শুরু থেকেই প্রকাশ্যে জানিয়ে এসেছে।
বিএনপি নির্বাচিত সংসদে আলোচনার মাধ্যমে এবং প্রয়োজন হলে বিল পাসের পথেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত ‘জুলাই চার্টার’-এর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দলটির নেতারা মনে করছেন, চার্টারের মতো একটি ব্যাপক সংস্কারপ্যাকেজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য সংসদই সবচেয়ে উপযুক্ত ও বৈধ প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে একদিকে গণভোটে পাওয়া জনসমর্থনের প্রতি সম্মান দেখানো হবে, অন্যদিকে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই প্রয়োজনীয় সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এতটা সরল নয়। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ইতোমধ্যেই এই উদ্যোগের বিরোধিতা করার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের মতে, জুলাই চার্টার এবং এর ভিত্তিতে গঠিত সংস্কার পরিষদ—উভয়ই রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত এবং সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে তারা সংসদে এই আলোচনার বিরোধিতা করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এই অবস্থান সংসদে শুরু থেকেই উত্তেজনা ও বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরোধী দলগুলোর কঠোর অবস্থান সংসদীয় কার্যক্রমকে বারবার বাধাগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলে অধিবেশন অচলাবস্থায় পড়ার ঝুঁকি থাকবে। বিতর্কিত ইস্যুতে সংসদে উচ্চস্বরে প্রতিবাদ, ওয়াকআউট বা স্থগিতাদেশের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে এবং সরকারের নীতি বাস্তবায়নও ব্যাহত হতে পারে।
ফলে জুলাই চার্টার নিয়ে সংসদীয় আলোচনার পথটি যেমন গণতান্ত্রিক ও বৈধ, তেমনি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদিকে বিএনপি সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বিরোধিতা সংসদকে শুরু থেকেই উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা যেমন সংকুচিত হতে পারে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রক্রিয়াও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থানকে অনেকেই সাংবিধানিক যুক্তির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করলেও, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এটিকে জনবিরোধী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। এর ফলে রাজপথে নতুন আন্দোলনের সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক শূন্যতার শঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বিনিয়োগ, বাজার স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতাও এই অনিশ্চয়তার কারণে চাপের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এটি নিছক রাজনৈতিক অস্থিরতা, নাকি ড. ইউনূসের পরিকল্পিত কোনো বৃহত্তর নকশার অংশ—এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোন পথে যাবে, সংস্কার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে এবং নির্বাচিত সরকার কতটা কার্যকরভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
নাশীত রহমান
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

