16.7 C
London
October 9, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে চায় ইসরায়েলঃ মর্যাদা কমল ব্রিটিশ কনস্যুলেটের

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার ব্রিটিশ পরিকল্পনা ঠেকাতে জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের কনস্যুলেট জেনারেল বন্ধের হুমকি দিয়েছিল ইসরায়েল। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে জেরুজালেমের ওপর ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতার ভিত্তিতে কনস্যুলেটের নাম ও কার্যক্রমের পরিধি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হলেও প্রতিষ্ঠানটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখবে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর প্রায় এক মাস আগে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের হুমকি দেন। যুক্তরাজ্য পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এসব বসতিকে অর্থায়ন ও অন্যান্য পরিষেবা দেওয়া কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছিল। ব্রিটিশ সরকারের এই পদক্ষেপ ঠেকাতেই ইসরায়েল কনস্যুলেট বন্ধের হুমকি দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের হুমকির জবাবে যুক্তরাজ্য ইসরায়েলি কূটনীতিকদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কারের পাল্টা হুমকি দেয়। এতে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দুই পক্ষই আপাতত সংঘাত এড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে।

সমঝোতা অনুযায়ী, জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট জেনারেলের নাম পরিবর্তন করে যুক্তরাজ্যের ‘মিশন’ রাখা হবে এবং সেখানে কূটনীতিকের সংখ্যা কমানো হবে। তবে প্রতিষ্ঠানটি তেল আবিবে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাসের অধীন হবে না; সরাসরি লন্ডনের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখবে। ফলে কনস্যুলেটের মর্যাদা কমলেও জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের স্বাধীন কূটনৈতিক উপস্থিতি পুরোপুরি বিলুপ্ত হচ্ছে না।

জেরুজালেমের ভূরাজনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইসরায়েলি আইনজীবী ড্যানিয়েল সাইডম্যানের মতে, এই সমঝোতা সম্ভাব্য আরও খারাপ পরিস্থিতি এড়ানোর একটি উপায়। তবে তার ভাষায়, প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে জেরুজালেমে ব্রিটেনের কূটনৈতিক উপস্থিতির মর্যাদা কমে যাওয়া কোনো বিজয় নয়।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। ১৯৮০ সালে দেশটির পার্লামেন্ট আইন করে পুরো জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে সংযুক্ত করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশই এই সংযুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি। জেরুজালেমের চূড়ান্ত মর্যাদা এখনো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেটের মতো আরও সাতটি দেশের কনস্যুলেট জেনারেল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ১৯৪৮ সালের আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং নিজ নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সরাসরি প্রতিবেদন দেয়। জাতিসংঘের ১৯৪৭ সালের ফিলিস্তিন বিভাজন পরিকল্পনায় জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক প্রশাসনাধীন পৃথক এলাকা হিসেবে রাখার প্রস্তাব ছিল। যদিও সেই পরিকল্পনা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি, এর সঙ্গে শহরটির বিশেষ আন্তর্জাতিক মর্যাদার ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

ড্যানিয়েল সাইডম্যানের মতে, জেরুজালেমে ইসরায়েলের একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে এই কূটনৈতিক বিরোধের সম্পর্ক রয়েছে। ইসরায়েলের একক কর্তৃত্বের অধীন নয়, এমন কূটনৈতিক উপস্থিতিও দেশটির সরকারের কাছে অস্বস্তিকর। যুক্তরাষ্ট্রও একসময় পূর্ব জেরুজালেমে কনস্যুলেট জেনারেল পরিচালনা করত। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ওই কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পশ্চিম তীরের ই১ এলাকায় ইসরায়েলের পরিকল্পিত বসতি নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের জন্য ইসরায়েলি সরকারের নতুন দরপত্র প্রকাশের বিষয়টি নিষেধাজ্ঞা এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারণ। ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ বলেছেন, প্রকল্পটি পশ্চিম তীরের বিভিন্ন অংশকে বিচ্ছিন্ন করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নষ্ট করবে।

সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইসরায়েলের ব্যাংকগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব নিষেধাজ্ঞা ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরে বসতি নির্মাণ প্রকল্পের চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইলান বারুখের মতে, ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের হুমকি থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা ইসরায়েলি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তার ধারণা, কনস্যুলেটের নাম পরিবর্তন ও কূটনীতিকের সংখ্যা কমানোর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য কিছু ছাড় দিয়েছে, যার ফলে ইসরায়েলও আপাতত সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে গেছে।

তবে এই সমঝোতা স্থায়ী সমাধান নয়। ইসরায়েলে নির্বাচনের পর নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে জেরুজালেমে ব্রিটিশ কূটনৈতিক মিশনের মর্যাদা ও কর্মীদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। ফলে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা এবং জেরুজালেমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দুই দেশের বিরোধ আবারও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এমকে

আরো পড়ুন

আমেরিকান সিক্রেট এজেন্টের কারণে যুক্তরাজ্যের এক নার্সের জীবন ঝুঁকির মুখে

নোভাভ্যাক্সের টিকা করোনার নতুন স্ট্রেইন প্রতিরোধে কার্যকর

যুক্তরাজ্যকে বাঁচাতে টোরিদের ছয় দফা রূপরেখাঃ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত