ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন দেশটির চারটি বিরোধী দলের নেতা। মঙ্গলবার হার্জলিয়ায় বৈঠক করে দ্রুত সরকার গঠনের আলোচনা শুরু এবং নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশনের আগেই সংসদীয় কৌশল সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে আরব দলগুলোর সমর্থন কীভাবে পাওয়া যাবে, তা নিয়ে এখনো মতৈক্য হয়নি।
গত সপ্তাহের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। বর্তমানে তার জোটের আসনসংখ্যা ৫৩। অন্যদিকে চারটি ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের আসন রয়েছে ৪৮টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে। দল দুটি সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেন ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট, বি’ইয়াচাদ পার্টির চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেট, ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান এবং ইসরাইল বেইতেনু পার্টির নেতা আভিগদর লিবারম্যান। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে তারা নেতানিয়াহু সরকারকে সরিয়ে নতুন জাতীয় সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেন।
নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গাদি আইজেনকটের প্রস্তাবিত চারটি নীতিকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিরোধী নেতারা। এগুলো হলো—ইসরাইলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার, সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গাজায় তাদের সামরিক সক্ষমতা ও শাসনের অবসান ঘটানো।
নতুন নেসেটের অধিবেশন শুরু হলে বিরোধীদের প্রথম পদক্ষেপগুলোর একটি হতে পারে লিকুদ পার্টির আইনপ্রণেতা আমির ওহানাকে স্পিকারের পদ থেকে সরানো। তার পরিবর্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিদায়ী পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদকে স্পিকার করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী সোমবার নেওয়ার কথা রয়েছে।
স্পিকার পরিবর্তন করা গেলে নেতানিয়াহুর বাধার মুখে থাকা কয়েকটি আইন প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি রয়েছে।
বিরোধী নেতারা প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ গাদি আইজেনকটকে দেওয়ার সুপারিশ করার বিষয়েও একমত হয়েছেন। একই সঙ্গে জোট গঠনের আলোচনা ও নীতিগত নির্দেশিকা তৈরির জন্য আলোচক দলকে অবিলম্বে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করতে ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন ও আহমেদ তিবির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নির্বাচনের পর এটিই ছিল তাদের প্রথম বৈঠক। সেখানে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু সরকারকে সরানো এবং আরব জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়।
গোলান প্রকাশ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ভবিষ্যৎ জোট সরকারে তাদের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। তবে বিরোধী জোটের অন্য নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
আভিগদর লিবারম্যান বলেছেন, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন ছাড়াই স্থিতিশীল সরকার গঠন সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, আরেকটি নির্বাচন ঠেকাতে হবে এবং সঠিকভাবে এগোলে রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন ছাড়াই কার্যকর সরকার গঠন করা সম্ভব। তবে কীভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা যাবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
বিরোধীরা জোট গঠনের আলোচনা চালানোর মধ্যেই তাদের সমালোচনা করেছেন নেতানিয়াহু। তার দল লিকুদ পার্টির অভিযোগ, বিরোধীরা আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে একটি বিপজ্জনক সরকার গঠন করতে চায়। গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে এমন সরকার কীভাবে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দলটি।
লিকুদ পার্টির দাবি, সম্ভাব্য সরকারের কয়েকজন সদস্য হামাস ও হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অনিচ্ছুক। অন্যদিকে বিরোধী নেতারা নেতানিয়াহুর জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে সরকারের ব্যর্থতার জন্য তারা নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন।
নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্কও নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিরোধী নেতারা নির্বাচনের ফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নেতানিয়াহু ও লিকুদ পার্টির প্রচারণার সমালোচনা করেছেন। তাদের ভাষায়, এটি একটি বিপজ্জনক প্রচারণা।
লিকুদ পার্টির অভিযোগ, কাতার বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তি গোপনে অর্থ দিয়ে আরব ভোটারদের ভোটদানে উৎসাহিত করেছে এবং নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিল দলটি। তবে নির্বাচন তদারকির দায়িত্বে থাকা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোআম সোলবার্গ সেই দাবি নাকচ করেছেন।
এদিকে সরকার গঠনে অতি-অর্থোডক্স ইহুদি বা হারেদি দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। লিবারম্যান আগে এসব দলের সঙ্গে সরকার গঠনের বিরোধিতা করলেও সাম্প্রতিক বক্তব্যে তার অবস্থান কিছুটা নমনীয় বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের নেতানিয়াহু-সমর্থক ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম দল আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর নেতানিয়াহুর নিজের সরকার গঠনের পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোও এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এবং বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য দূর করার ওপরই নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা নির্ভর করছে। আলোচনা ব্যর্থ হলে ইসরাইলে আবারও নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সূত্রঃ টাইমস অব ইসরাইল \ চ্যানেল ১২
এমকে

