9.9 C
London
October 22, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

প্যারিসে দাঙ্গায় বাংলাদেশির দোকান ধ্বংসঃ ১০ বছরের পরিশ্রমে ছাই

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে দাঙ্গা ও লুটপাটে ধ্বংস হয়ে গেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী হাসানের দোকান। প্রায় ১০ বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা প্রযুক্তিপণ্য ও পার্সেল সরবরাহের ব্যবসা হারিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি। ঘটনার পর থেকে তিন দিন ঘুমাতে পারেননি বলে জানিয়েছেন এই প্রবাসী বাংলাদেশি।

ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজের ২১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসান ২০১০ সালে বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে যান। কয়েক বছর হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে কাজ করার পর সঞ্চয় দিয়ে ২০১৬ সালে এক সহযোগীর সঙ্গে নিজের ব্যবসা শুরু করেন। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকার কাছাকাছি একটি প্রধান সড়কের পাশে ছিল তার দোকান।

হাসান বলেন, প্রায় ১০ বছর ধরে ধীরে ধীরে তারা ব্যবসাটি গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু সপ্তাহান্তের দাঙ্গায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। হামলাকারীরা তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে এবং মাথায় মদের বোতল ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেয়। প্রাণের ভয়ে তাকে দোকান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হতে হয়।

দোকানের ভেতরে এখন ভাঙা মোবাইল ফোন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পার্সেল এবং কাচের টুকরো পড়ে রয়েছে। বীমা কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের অপেক্ষায় থাকায় তিনি এখনো ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে পারছেন না। অন্যদিকে দোকানের ভাড়া, বিল ও কর্মীদের বেতন দেওয়ার দায়ও তার ওপর রয়েছে।

শনিবার বিকেলে ফরাসি কর্তৃপক্ষের পরামর্শে দোকান বন্ধ করে দিয়েছিলেন হাসান। কয়েক ঘণ্টা পর মোবাইল ফোনে নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ দেখতে গিয়ে দোকানের ভেতরে প্রায় ৩০ জনকে দেখতে পান তিনি। দৃশ্যটি দেখে হতবাক হয়ে দ্রুত সেখানে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে এলাকায় সহিংসতা চলতে থাকায় পুলিশ প্রথমে তাকে দোকানের আশপাশের নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হওয়ার অনুমতি দেয়নি। পরে মোবাইল ফোনে দোকান ধ্বংসের সরাসরি দৃশ্য দেখানোর পর তাকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তিনি নিজেকে অসহায় অবস্থায় দেখতে পান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তখন ঘটনাস্থলে কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখতে পাননি।

ইউরোনিউজের হাতে আসা পৃথক ভিডিওতে দেখা গেছে, লুটপাটকারীরা দোকানসংলগ্ন একটি আবাসিক ভবনে প্রবেশ করছে। প্রতিবেশীরা তাদের থামানোর অনুরোধ করলেও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকায় বাধা দিতে পারেননি।

হাসান জানান, লুটপাটকারীদের মধ্যে কিশোর-কিশোরীও ছিল। একদল চুরি শেষ করলে আরেক দল এসে হাজির হতো। দোকান থেকে মোবাইল ফোন, প্রযুক্তিপণ্য ও পার্সেল চুরি করা হয়। এমনকি নিচতলার গুদামও তছনছ করা হয়েছে।

দোকানের বিপরীত পাশে অবস্থিত ফ্রান্সের অন্যতম বড় সুপারমার্কেট চেইন ইন্টারমার্শের একটি শাখাও লুটপাটের পর থেকে বন্ধ রয়েছে। কর্মীরা কয়েক দিন ধরে ভাঙা কাচ পরিষ্কার এবং নতুন পণ্য দিয়ে তাক সাজানোর কাজ করছেন।

স্থানীয় এক পার্সেল সরবরাহকারী ইউরোনিউজকে বলেন, তারা সততার সঙ্গে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে চান, অথচ অন্যরা সবকিছু ধ্বংস করছে। কিছু কট্টর বামপন্থি কর্মী ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার নিন্দা জানালেও বড় সুপারমার্কেট ও কোম্পানিতে লুটপাটের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল মনোভাব দেখিয়েছেন। তাদের দৃষ্টিতে এসব প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাদের প্রতীক। তবে ওই সরবরাহকারী বলেন, লুটপাটের কারণে সবকিছুই ধ্বংস হয়েছে, তাই এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই।

হাসানকে সহায়তা করতে স্থানীয় বাসিন্দা নোয়াম অনলাইনে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে সেখানে হাজারো মানুষের অনুদান এসেছে। নোয়াম জানান, পার্সেল সরবরাহসহ বিভিন্ন কাজে হাসানের সঙ্গে স্থানীয়দের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাই এই কঠিন সময়ে তাকে সহযোগিতা করতে তারা এগিয়ে এসেছেন।

ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবনতিশীল পরিস্থিতির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের চার সপ্তাহের বিক্ষোভের পর সপ্তাহান্তে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। শনিবারের বিক্ষোভে ট্রেড ইউনিয়ন, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সদস্য এবং শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। অধিকাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করলেও বিভিন্ন এলাকায় লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বিশেষ করে রাবার বুলেট নিক্ষেপকারী অস্ত্র ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের কারণে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।

সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে ফরাসি সরকার জরুরি আর্থিক সহায়তা ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচি চালু করেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মঙ্গলবার থেকে কর্মীদের জন্য সরকারের অর্থায়নে আংশিক কর্মবিরতি বা ‘অ্যাক্টিভিতে পার্তিয়েল’ ব্যবস্থার সুবিধা নিতে পারবে।

আগামী ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভ সামনে রেখে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণাও দিয়েছে সরকার।

সূত্রঃ ইউরোনিউজ

এমকে

আরো পড়ুন

ব্যবহারকারীদের আশ্বাস ট্রাম্পের, যুক্তরাষ্ট্রে ফের চালু টিকটক

রাশিয়ার সঙ্গে ২০ বছরের প্রতিরক্ষা চুক্তি করল ইরান

বছরে ৬০ হাজার কর্মী নেবে জার্মানি