12.8 C
London
October 10, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর মেয়েকে জাতিসংঘে নিয়োগঃ স্বার্থের সংঘাত দেখছেন দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরে আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই নিয়োগ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির জন্য নির্ধারিত নৈতিক আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে আনতে পারে।

সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমান একই সঙ্গে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়েকে তার দপ্তরে নিয়োগ দেওয়ায় সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইন্টেগ্রিটি বিভাগের অধ্যাপক এলিজাবেথ ডেভিড-ব্যারেট নেত্র নিউজকে বলেন, বিষয়টি নৈতিক আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা হতে পারে এবং এতে স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খালিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক নিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর মেয়েকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানও এই নিয়োগকে স্বার্থের সংঘাতের স্পষ্ট উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে রাজনৈতিক নিয়োগ পাওয়া একজন ব্যক্তি যখন সেই প্রধানমন্ত্রীর মেয়েকে নিজের দপ্তরে নিয়োগ দেন, তখন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তর নিয়োগের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে। সভাপতির মুখপাত্র মেলিসা সামার্স বলেছেন, নিয়োগটি জাতিসংঘের নিয়মকানুন মেনেই হয়েছে এবং খালিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তা সম্পন্ন হয়েছিল।

জাইমা রহমানকে গত ১৫ জুলাই নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, খালিলুর রহমান ২ জুন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অর্থাৎ, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই নিয়োগটি হলেও নির্বাচিত হওয়ার প্রায় ছয় সপ্তাহ পর তা সম্পন্ন হয়েছিল।

নেত্র নিউজের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, জাইমা রহমানকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে খালিলুর রহমান কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন কি না। জবাবে মুখপাত্র মেলিসা সামার্স এ বিষয়ে সরাসরি কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার আর কিছু যোগ করার নেই।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরের জন্য নির্ধারিত নৈতিক আচরণবিধিতে ব্যক্তিগত বা নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গে সভাপতির দপ্তর কিংবা জাতিসংঘের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে—এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো দেশ, সংস্থা বা ব্যক্তিকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার ধারণা তৈরি করতে পারে, এমন কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে।

জাইমা রহমানের নিয়োগটি এক বছরের চুক্তিভিত্তিক। পদটি জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেট থেকে অর্থায়ন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পদে প্রাথমিক বার্ষিক বেতন প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

জাইমা রহমানের নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতেই চাকরি পেয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, জাতিসংঘের প্রচলিত নিয়ম ও নিয়োগপ্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করেই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

৩০ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও দপ্তরের মুখপাত্র মাহদি আমিন বলেন, জাইমা রহমান নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে পি-৩ পদে নিয়োগ পেয়েছেন। এই পদের জন্য পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন এবং তার পেশাগত অভিজ্ঞতা সেই মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি দাবি করেন। এ নিয়োগে সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না বলেও তিনি জানান।

জাতিসংঘের মানবসম্পদসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা সমমানের যোগ্যতা থাকলে পি-৩ পদে সাধারণত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। শুধু স্নাতক ডিগ্রি থাকলে প্রয়োজন সাত বছরের অভিজ্ঞতা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাইমা রহমান আইন বিষয়ে ডিগ্রিধারী এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বার কাউন্সিলের আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তার বার কোর্সকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান হিসেবে গ্রহণ করা হলে এ পদের জন্য তার পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার কথা।

তবে তার লিংকডইন প্রোফাইলে উল্লেখিত তারিখ অনুযায়ী, ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত তার পেশাগত কাজের তথ্য পাওয়া যায়, যা দুই বছরেরও কম সময়ের। এর মধ্যে নিউক্লিয়াস লিগ্যাল অ্যাডভাইস সেন্টারে ১১ মাস পূর্ণকালীন অ্যাকসেস কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করার তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি স্ট্র্যান্ড চেম্বার্সে পাঁচ মাস খণ্ডকালীন আইন সহকারী হিসেবে কাজ এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে আদালতে আইনসংক্রান্ত কাজ করার উল্লেখ রয়েছে।

জাইমা রহমানের জাতিসংঘের জীবনীতে স্বাস্থ্যসেবা খাতে আইনি পরামর্শ ও জনসংযোগের কাজ এবং ঢাকার আইন প্রতিষ্ঠান সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসে কাজের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব কাজের সময়কাল ও বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে তিনি সেখানে কবে এবং কত দিন কাজ করেছেন, তা জানানো হয়নি।

প্রতিবেদন অনুসারে, জাইমা রহমান ২০০৮ সাল থেকে বিদেশে বসবাস করছিলেন এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ঢাকায় ফেরেন। ফলে ঢাকায় ফেরার পর থেকে ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ওই আইন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকলেও তার অভিজ্ঞতার সময়কাল সীমিত হওয়ার কথা। তবে তিনি দূর থেকে কাজ করেছেন কি না, তা প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।

জাতিসংঘের সভাপতির দপ্তর জানিয়েছে, নিয়োগের শর্তে নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে জাইমা রহমানের আবেদন যাচাই করা হয়েছিল এবং নিয়োগটি জাতিসংঘের বিধিবিধান অনুযায়ী হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা বিস্তারিত শর্তাবলি প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দপ্তরটি।

নেত্র নিউজ জানিয়েছে, জাইমা রহমানের কাছে ইমেইলে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

সূত্রঃ নেত্র নিউজ

এমকে

আরো পড়ুন

বাবা শহীদ হলে ১৯৮১ সালে জন্ম কীভাবে? সংসদে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে চাপে জামায়াত সাংসদ

সীমান্ত খুলে দিতে বাংলাদেশকে চাপ, বিরক্ত সরকার

বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিচ্ছেন না মাসরুর রিয়াজ