আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাজ্যকে নতুন করে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, তার দেশ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ‘দাঁতে দাঁত চেপে’ লড়াই করবে—এতে যে-ই অসন্তুষ্ট হোক না কেন।
মিলে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে একটি ‘জাতীয় ঘোষণা’ দেবেন। তিনি দ্বীপগুলোকে আর্জেন্টাইন জনগণের কাছে ‘পবিত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং দাবি করেছেন, তার দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এখনো লঙ্ঘিত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মিলে লিখেছেন, বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় একটি ‘পবিত্র বিষয়’ নিয়ে জাতীয় সম্প্রচার করা হবে। তার ভাষায়, এটি আর্জেন্টাইন জনগণের একটি ঐতিহাসিক দাবি, যার ক্ষেত্রে এখনো তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য ফকল্যান্ড বা মালভিনাস ইস্যুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আর কী হতে পারে। আর্জেন্টিনা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ‘দাঁতে দাঁত চেপে’ লড়াই চালিয়ে যাবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
মিলের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ডাউনিং স্ট্রিট মঙ্গলবার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রতি যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকার ‘অটল’। ব্রিটিশ সরকারের মুখপাত্র বলেন, দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব যুক্তরাজ্যের হাতে রয়েছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা বারবার ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ছায়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস কার্টলিজও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ফকল্যান্ড ব্রিটিশ এবং ব্রিটিশই থাকবে।’
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ফকল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও দ্বীপবাসীর স্বাধীনতা রক্ষায় ব্রিটিশ সেনারা যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ কখনো ভুলে যাওয়া হবে না এবং ফকল্যান্ডের জনগণের পাশে যুক্তরাজ্য সবসময় থাকবে বলেও তিনি জানান।
ফকল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষ। তবে ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জে সামরিক অভিযান চালানোর পর যুক্তরাজ্য যখন তা পুনর্দখলের জন্য যুদ্ধ করে, তখন ওয়াশিংটন ব্রিটেনকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ফকল্যান্ড ইস্যুতে তার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সব ধরনের অবস্থানই পর্যালোচনা করেন এবং ফকল্যান্ড ইস্যুটি এমন অনেক বিষয়ের মধ্যে একটি, যেগুলো তিনি পর্যালোচনা করছেন।
২০১৩ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন। ওই গণভোটে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন; বিপক্ষে পড়েছিল মাত্র তিনটি ভোট।
তবে আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপগুলোর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি করে আসছে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক বাহিনী ফকল্যান্ড দখল করলে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ বাহিনী দ্বীপগুলো পুনর্দখল করে।
যুদ্ধের চার দশকের বেশি সময় পরও ফকল্যান্ড ইস্যুটি আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে রয়েছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং মিলের নতুন ঘোষণায় সেই পুরোনো বিরোধ আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
এদিকে চলতি গ্রীষ্মে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের উদযাপনেও ফকল্যান্ড ইস্যু সামনে আসে। খেলোয়াড়রা ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন, যার অর্থ ‘ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার’।
ফলে ট্রাম্পের অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত, লন্ডনের অটল অবস্থান এবং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের নতুন কড়া হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে পুরোনো বিরোধ আবারও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট
এম.কে

