যুক্তরাজ্যে ইতোমধ্যে কর্মরত শত-সহস্র কেয়ার কর্মীর জন্য বড় স্বস্তির বার্তা আসতে পারে। সামাজিক সেবা (সোশ্যাল কেয়ার) খাতে চলমান কর্মী সংকট মোকাবিলা এবং ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)-এর ওপর চাপ কমাতে বর্তমান কেয়ার কর্মীদের কঠোর নতুন অভিবাসন নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে ব্রিটিশ সরকার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম আগামী সপ্তাহে সামাজিক সেবা খাত নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন। সেখানে তিনি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগেই একটি ন্যাশনাল কেয়ার সার্ভিস গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবেন। একই সঙ্গে সামাজিক সেবা সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে লেডি লুইস কেসির নেতৃত্বাধীন পর্যালোচনার কাজও এগিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত নতুন অভিবাসন নীতিতে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (ILR) পাওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে কর্মরত কেয়ার কর্মীদের এই নতুন নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম।
যদিও আগামী সপ্তাহের ভাষণে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে বছরের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনপরামর্শ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানান, সামাজিক সেবা ব্যবস্থা সংস্কার প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যামের কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি বিষয়। তার বাবা রয় বার্নহ্যাম আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই খাতের সংকট ঘনিষ্ঠভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং দ্রুত পরিবর্তন আনতে চান।
সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বার্নহ্যাম বলেন, তার বাবার চিকিৎসার অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন কেয়ার কর্মীরা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করছেন। তাদের দোষ নয়, বরং পুরো ব্যবস্থাটিই দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সামাজিক সেবা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে এবং ওয়েস্টমিনস্টার বহু বছর ধরে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বর্তমানে ইংল্যান্ডে যাদের সম্পদের পরিমাণ ২৩ হাজার ২৫০ পাউন্ডের কম, তারা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে সামাজিক সেবা পেয়ে থাকেন। এর বেশি সম্পদ থাকলে নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়। অন্যদিকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কম অর্থায়নের কারণে সামাজিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও চরম আর্থিক চাপে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কেয়ার খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করে বলেছেন, অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে সময় দ্বিগুণ করা হলে কর্মী ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়বে এবং সংকট আরও গভীর হবে।
যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন ইউনিসনের মহাসচিব আন্দ্রেয়া ইগান বলেন, সরকার যদি নিয়োগ ও কর্মী ধরে রাখার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার না দেয়, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই অভিবাসী কেয়ার কর্মীদের জন্য কঠোর নতুন নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রায় দুই লাখ স্বাস্থ্য ও কেয়ার কর্মী ভিসা ইস্যু করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে বহু নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যও যুক্তরাজ্যে এসেছেন। ফলে বর্তমান কেয়ার কর্মীদের নতুন নিয়ম থেকে অব্যাহতি দিলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এর সুবিধা পেতে পারেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী আগামী সপ্তাহের ভাষণে সামাজিক সেবা খাতের জন্য কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপও ঘোষণা করতে পারেন। এর মধ্যে £৯ বিলিয়নের বেটার কেয়ার ফান্ড-এ অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বিনামূল্যে সামাজিক সেবা চালুর প্রস্তাব থাকতে পারে, যাতে তারা পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি না হন এবং NHS-এর ওপর চাপ কমে।
পাশাপাশি সামাজিক সেবা সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিষয়টিও আলোচনায় থাকবে। লেডি লুইস কেসির নেতৃত্বাধীন পর্যালোচনায় কারা সামাজিক সেবা পাওয়ার যোগ্য হবেন, পরিবার ও ব্যক্তির আর্থিক দায়িত্ব কতটা হবে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে একটি টেকসই সামাজিক সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
যদি বর্তমান কেয়ার কর্মীদের জন্য বিশেষ অব্যাহতির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়, তবে তা যুক্তরাজ্যে কর্মরত হাজার হাজার বাংলাদেশিসহ বিদেশি কেয়ার কর্মীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

