দেশের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার-এর বালুতে ইউরেনিয়াম বা তেজস্ক্রিয় খনিজ থাকার বিষয়টি নিয়ে বহুদিন ধরেই জনমনে কৌতূহল রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গুজবের কারণে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিও ছড়িয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বলছে, বাস্তবতা গুজবের চেয়ে ভিন্ন এবং অনেক বেশি সূক্ষ্ম।
গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজারের সৈকতজুড়ে থাকা বালুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভারী খনিজ (হেভি মিনারেল) পাওয়া যায়। এর মধ্যে ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন, মনাজাইট, গার্নেট ও ম্যাগনেটাইট উল্লেখযোগ্য। এসব খনিজ শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে বিবেচিত।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এসব খনিজের মধ্যে বিশেষ করে মনাজাইট ও জিরকনের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই অল্পমাত্রায় ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম উপস্থিত থাকে। তবে এই উপস্থিতি খুবই সীমিত এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। অর্থাৎ, কক্সবাজারে সরাসরি খনি খননের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম উত্তোলন সম্ভব—এমন ধারণা সঠিক নয়।
গবেষণা অনুযায়ী, এখানে ইউরেনিয়াম কোনো স্বতন্ত্র আকরিক (ore) হিসেবে মজুদ নেই; বরং অন্যান্য খনিজের সঙ্গে মিশ্র অবস্থায় অল্পমাত্রায় বিদ্যমান। ফলে এটিকে পারমাণবিক জ্বালানির বড় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
অন্যদিকে, কক্সবাজার উপকূলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জিরকন ও মনাজাইটসহ বিভিন্ন ভারী খনিজের মজুদ রয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। এসব খনিজ শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকলেও এখনো পূর্ণমাত্রায় বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, বালু থেকে এসব খনিজ পৃথক করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিশাল পরিমাণ বালু প্রক্রিয়াজাত করে তুলনামূলক কম পরিমাণ খনিজ পাওয়া যায়, যা অর্থনৈতিকভাবে খুব লাভজনক নয়।
দ্বিতীয়ত, মনাজাইটের মতো খনিজে তেজস্ক্রিয় উপাদান থাকায় উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। এতে খরচ ও জটিলতা আরও বেড়ে যায়।
তৃতীয়ত, পরিবেশগত ঝুঁকিও বড় একটি কারণ। কক্সবাজার দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় এখানে বড় আকারে বালু উত্তোলন করলে সৈকতের প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে পর্যটন শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চতুর্থত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া এই ধরনের খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়।
এছাড়া নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পরিবেশগত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। এ কারণে এখন পর্যন্ত বড় পরিসরে খনিজ উত্তোলনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কক্সবাজারের বালুতে কিছু তেজস্ক্রিয় উপাদানসহ মূল্যবান খনিজের উপস্থিতি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য হলেও, তা বড় ধরনের ইউরেনিয়াম খনি নয়। অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতার কারণে এই সম্ভাবনাকে এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারে ইউরেনিয়াম আছে—এই বক্তব্য আংশিক সত্য। তবে এটি খনি করার মতো সমৃদ্ধ উৎস নয়; বরং অন্যান্য খনিজের ভেতরে অল্পমাত্রায় থাকা একটি উপাদান মাত্র।
সূত্রঃ সাইন্স ডাইরেক্ট
এম.কে

