ব্রেক্সিট-পরবর্তী বিশেষ ছাড়ের আওতায় যুক্তরাজ্যে বিদেশি নাগরিকদের বিপুল পরিমাণ শিক্ষাঋণ ও জীবনযাপন ব্যয়ের অনুদান দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৪ বিলিয়ন পাউন্ড শিক্ষাঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ হয়েছে। এর বড় অংশই পেয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা।
তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঋণ নেওয়ার পর তা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম সম্ভাবনাময়। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অপরিশোধিত ঋণ ও ফি বাবদ ব্রিটিশ করদাতাদের ওপর প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২.২ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শিক্ষাঋণ ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রোমানিয়ার নাগরিকদের সংখ্যা। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের নতুন প্রথমবারের শিক্ষাঋণের প্রতি ২০টির মধ্যে প্রায় একটি রোমানিয়ার নাগরিকদের নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। এ ধরনের প্রবণতা সরকারের মধ্যে সম্ভাব্য জালিয়াতি ও ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
স্টুডেন্ট লোন কোম্পানির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট ২ লাখ ৩৯ হাজার বিদেশি নাগরিক শিক্ষাঋণ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৯৫ হাজারেরও বেশি ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’-এর ভিত্তিতে এই আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—ব্রেক্সিটের পর নির্ধারিত বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় বিদেশি নাগরিকদের শিক্ষায় এত বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় করা কতটা যুক্তিসংগত এবং এর কতটা শেষ পর্যন্ত ফেরত আসছে।
কনজারভেটিভ এমপি নিল ও’ব্রায়েন শিক্ষাঋণ ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে সরাসরি সতর্ক করেছেন। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাটিতে ‘অপব্যবহারের স্পষ্ট লক্ষণ’ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক সরকারি অর্থের এই সুবিধা পাচ্ছেন—এ বিষয়টিকে তিনি ‘পাগলাটে’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষাঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর যোগ্যতার নিয়ম রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের বাইরে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষাঋণ পাওয়ার সুযোগ পান না। অর্থাৎ বিদেশি নাগরিক হওয়া মাত্রই কেউ এই সুবিধা পাওয়ার অধিকারী নন; নির্দিষ্ট আবাসিক ও অন্যান্য যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হয়।
তবু ঋণ পরিশোধের হার নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা শেষ করে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে সরকারি অর্থায়নে দেওয়া ঋণের কতটা বাস্তবে ফেরত আসছে এবং কতটা শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ছায়া শিক্ষামন্ত্রী লরা ট্রট এমপি সরকারের শিক্ষাঋণ ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে বলেছেন, যে বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড শেষ পর্যন্ত ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেই অর্থের বোঝা ব্রিটিশ করদাতাদের বহন করা উচিত নয়। তার অভিযোগ, সরকারকে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, “লেবারকে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।”
ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাঋণ ও আর্থিক সহায়তার নিয়ম, বিদেশি নাগরিকদের ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’-এর মাধ্যমে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ এবং ঋণ পরিশোধের হার—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরেই মূলত বিতর্কটি তীব্র হচ্ছে। সরকার যেখানে বিদ্যমান নিয়ম ও যোগ্যতার শর্তকে যথেষ্ট কঠোর বলে দাবি করছে, বিরোধীরা সেখানে বিপুল সরকারি অর্থের সম্ভাব্য অপচয় ও ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানাচ্ছে।
সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস
এম.কে

