গাজা ও পশ্চিম তীরে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় জাতিসংঘের বাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশ সেনা পাঠানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের স্বতন্ত্র এমপি আয়ুব খান। লেবার এমপি তাহির আলী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সামরিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে পরে ক্ষমা চাওয়ার পরপরই আয়ুব খানের এই বক্তব্য সামনে আসে।
বার্মিংহাম পেরি বার আসনের এমপি আয়ুব খান ১৭ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে বলেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে বেসামরিক নাগরিকদের ‘নিপীড়ন, অধীনতা ও হত্যাকাণ্ড’ থেকে সুরক্ষা দিতে জাতিসংঘের বাহিনী প্রবেশ করলে তা সমর্থনে তার ‘কোনো দ্বিধা নেই’। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, এ ধরনের বাহিনীর মধ্যে ব্রিটিশ সেনাও থাকতে পারে।
আয়ুব খান আরও বলেন, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সময় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর হামলায় তিন ব্রিটিশ সাবেক সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পরই তিনি ব্রিটিশ সেনা পাঠানোর পক্ষে থাকতেন। তিনি ২০২৪ সালে গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের একটি ত্রাণবাহী গাড়িবহরে হামলার ঘটনাকে এর প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করেন।
ওই হামলার ঘটনায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী পরে স্বীকার করেছিল যে হামলাটি ভুল ছিল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, সেনারা অনুমোদনহীন বন্দুকধারীদের লক্ষ্যবস্তু করতে গিয়ে গাড়িগুলোর অবস্থান ভুলভাবে শনাক্ত করেছিল। এ ঘটনায় দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত এবং আরও তিন কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিরস্কার করা হয়।
আয়ুব খানের মন্তব্য আসে লেবার এমপি তাহির আলীর বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই। ১৪ সেপ্টেম্বর হাউস অব কমন্সে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিষয়ক এক বিতর্কে তাহির আলী প্রশ্ন তোলেন, হামাসকে নিরস্ত্র করার পাশাপাশি ইসরায়েলকেও নিরস্ত্র করার আহ্বান জানানো উচিত কি না। তিনি গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘন মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ সুরক্ষার জন্য ব্রিটিশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে; তাই ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে কি না।
তাহির আলীর ওই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। পরদিন তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন এবং ব্রিটিশ সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নটি আবারও উত্থাপন করেন। পরে সেই পোস্ট ও বক্তব্যের ভিডিও মুছে ফেলা হয়।
১৬ সেপ্টেম্বর তাহির আলী তার অবস্থান প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, পার্লামেন্টে তার বক্তব্যের মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সমর্থক হিসেবে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও সামরিক পদক্ষেপের সমর্থন করেন না এবং দীর্ঘদিন ধরে শান্তি ও সংঘাত নিরসনের পক্ষে প্রচার করে আসছেন।
দ্য জিউইশ ক্রনিকল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাহির আলীকে এ ঘটনার জন্য লেবার পার্টির প্রধান হুইপ আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করেছেন। লেবার পার্টির একজন মুখপাত্র তার মন্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করে জানান, আলী প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন এবং প্রধান হুইপ তাকে লেবার এমপিদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত আচরণবিধি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
তাহির আলীর ক্ষমাপ্রার্থনার পর আয়ুব খানের বক্তব্যে ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু জাতিসংঘের বাহিনীর গাজা ও পশ্চিম তীরে প্রবেশের সমর্থনই জানাননি, বরং প্রয়োজনে ব্রিটিশ সেনা পাঠানোর কথাও উল্লেখ করেন।
আয়ুব খান ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বার্মিংহাম পেরি বার আসন থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। তিনি সাবেক ব্যারিস্টার এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট কাউন্সিলর ছিলেন। পার্লামেন্টে তার কার্যক্রমের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে একাধিক বক্তব্য ও প্রশ্ন রয়েছে।
তাহির আলী ২০১৯ সাল থেকে বার্মিংহাম হল গ্রিন অ্যান্ড মোসলি আসনের এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গাজা যুদ্ধ নিয়ে এর আগেও তিনি ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছেন। ২০২৫ সালে তিনি গাজায় ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষায় ব্রিটিশ সামরিক সদস্য পাঠানোর বিষয়ে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে প্রশ্নও তুলেছিলেন।
এদিকে আয়ুব খানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গাজা ইস্যুতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে।
সূত্রঃ দ্য জিউইশ ক্রনিকল\দ্য টাইমস অব ইসরায়েল
এমকে

