Categories
যুক্তরাজ্য (UK)

লন্ডনের আয়করের বড় অংশ সাদিক খানের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব

লন্ডনের পরিবহন, আবাসন ও স্থানীয় পরিষেবায় অর্থায়ন বাড়াতে শহরে সংগৃহীত আয়করের আরও বড় অংশ মেয়র সাদিক খানের নেতৃত্বাধীন গ্রেটার লন্ডন অথরিটির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে থিংকট্যাংক সেন্টার ফর সিটিজ। কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদাননির্ভর বর্তমান অর্থায়ন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে আয়কর ও করপোরেশন করের একটি অংশ মেয়রদের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

মাই লন্ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডের ১৪ জন মেয়রের মধ্যে সাতজন বর্তমানে ‘ইন্টিগ্রেটেড সেটেলমেন্ট’ পান। এই একক অনুদানের মাধ্যমে পরিবহন, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সহায়তা ও আবাসনের মতো বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতির খাতে অর্থায়ন করা হয়।

বর্তমান ব্যবস্থায় মেয়রভিত্তিক কর্তৃপক্ষগুলো বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ড কেন্দ্রীয় সরকারি অনুদান পায়। এর মধ্যে গ্রেটার লন্ডন অথরিটির জন্য বরাদ্দ প্রায় ২.১৬ বিলিয়ন পাউন্ড, যা লন্ডনের প্রতিটি বাসিন্দার হিসাবে বছরে প্রায় ২৩৭ পাউন্ডের সমান।

সরকার ইতোমধ্যে মেয়রভিত্তিক কৌশলগত কর্তৃপক্ষগুলোকে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত আয়করের একটি অংশ নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ব্যবসায়িক হারের রাজস্ব আরও বেশি স্থানীয়ভাবে ধরে রাখার বিষয়েও সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সেন্টার ফর সিটিজ অবশ্য আরও বেশি আর্থিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সুপারিশ করেছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, লন্ডনে সংগৃহীত আয়করের ২.৩ শতাংশ এবং করপোরেশন করের ০.৮ শতাংশ গ্রেটার লন্ডন অথরিটির হাতে দেওয়া উচিত। থিংকট্যাংকটির হিসাবে, এতে বর্তমান কেন্দ্রীয় অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ পাওয়া যাবে এবং সিটি হলের বাজেটের ওপর মেয়রের নিয়ন্ত্রণও বাড়বে।

প্রতিবেদনে আয়করকে মেয়রভিত্তিক কর্তৃপক্ষগুলোর অর্থায়নের প্রধান ভিত্তি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে ‘ইকুয়ালাইজেশন’ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। কোনো এলাকায় নির্ধারিত সীমার বেশি আয়কর রাজস্ব সংগ্রহ হলে অতিরিক্ত অর্থ অন্য মেয়রভিত্তিক কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হতে পারে।

করপোরেশন করকে স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা হিসেবে ব্যবহারেরও প্রস্তাব দিয়েছে সেন্টার ফর সিটিজ। তাদের মতে, করপোরেশন করের একটি ছোট অংশ স্থানীয়ভাবে রাখা হলেও এর ক্ষেত্রে ইকুয়ালাইজেশন না থাকলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য আরও বেশি উৎসাহ পাবে।

সেন্টার ফর সিটিজের বিশ্লেষক অস্কার সেলবি বলেছেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে মেয়রের সিটি হলের অর্থব্যবস্থার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে। স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ফলে করভিত্তি বাড়লে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি অতিরিক্ত অর্থ পাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সেলবির মতে, এর ফলে গণপরিবহন, আবাসন এবং স্থানীয় পরিষেবায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয়ভাবে পাওয়া রাজস্ব ঋণের নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

লন্ডন অ্যাসেম্বলির লেবার সদস্য ও ওভারসাইট স্পোকসপারসন বাসাম মাহফুজও লন্ডনের জন্য আরও বেশি আর্থিক ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, লন্ডনে সংগৃহীত অর্থের ওপর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন এবং নতুন ডিভল্যুশন চুক্তিতে আর্থিক ক্ষমতা হস্তান্তরকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা উচিত।

মাহফুজ আরও বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে সেই ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতাও থাকতে হবে। লন্ডনকে নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের আরও ক্ষমতা এবং শহরে সংগৃহীত করের বড় অংশ নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।

সেন্টার ফর সিটিজের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চার বছরে মেয়রভিত্তিক কর্তৃপক্ষগুলোর হাতে আনুমানিক ২১.৫ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত রাজস্বের ক্ষমতা হস্তান্তর হতে পারে। এই হিসাব ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ধরে করা হয়েছে।

লন্ডনের আয়কর রাজস্বের আরও বড় অংশ রাজধানীতে রাখার দাবি মেয়র সাদিক খান দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন। ২০১৯ সালের একটি সিটি হল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লন্ডনবাসী ও ব্যবসাগুলোর কাছ থেকে সংগৃহীত মোট করের মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ লন্ডনে থেকে যায়। একই প্রতিবেদনে নিউইয়র্কের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং টোকিওর ক্ষেত্রে প্রায় ৭০ শতাংশ রাজস্ব স্থানীয়ভাবে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

বর্তমানে ইংল্যান্ডে সংগৃহীত মোট করের প্রায় ৫ শতাংশ মেয়র ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে এবং প্রায় ৯৫ শতাংশ সরাসরি ওয়েস্টমিনস্টারের নিয়ন্ত্রণে যায়। লন্ডন থেকে সরকারের মোট রাজস্বের প্রতি ১০ পাউন্ডের মধ্যে প্রায় ৪ পাউন্ড আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বর্তমান সরকারের অধীনে মেয়রভিত্তিক কৌশলগত কর্তৃপক্ষগুলো শিগগিরই সরাসরি কর বাড়ানোর ক্ষমতা পাবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। প্রধানমন্ত্রী ব্যাপক ডিভল্যুশনের পক্ষে অবস্থান নিলেও মেয়রদের কর-রাজস্বের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রস্তাবগুলো এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

এর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন রাজস্বের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে রাতযাপনের ওপর ‘ভিজিটর লেভি’ বা পর্যটন কর চালুর পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থানীয় নেতারা হোটেল, বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্টসহ বিভিন্ন আবাসন ব্যবস্থার খরচের ওপর শতাংশ হিসেবে এই লেভি আরোপ করতে পারবেন। লন্ডনে এই হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের বেশি হবে না বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সূত্রঃ মাই লন্ডন

এম.কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *