TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটিশ পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে, মুসলিমদের ‘কম ব্রিটিশ’ বললেন রিস্টোর নেতা

ব্রিটেনে কে প্রকৃত অর্থে ‘ব্রিটিশ’—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রিস্টোর ব্রিটেনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও দলটির প্রচার পরিচালক চার্লি ডাউনসের মন্তব্যকে ঘিরেই এ বিতর্কের সূত্রপাত। তিনি দাবি করেছেন, খ্রিস্টানদের তুলনায় মুসলিমরা ‘কম ব্রিটিশ’ এবং ব্রিটিশ পরিচয়ের সঙ্গে দেশের বংশপরম্পরা ও খ্রিস্টান ধর্মীয় ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

টকটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ পরিচয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ডাউনস বলেন, ব্রিটিশ হওয়ার বিষয়টি শুধু নাগরিকত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে এই ভূখণ্ডের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, পূর্বপুরুষের সংযোগ এবং সর্বোপরি খ্রিস্টান বিশ্বাস জড়িত। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ খ্রিস্টান নীতিতে বিশ্বাসী না হলে তাকে তুলনামূলকভাবে কম ব্রিটিশ হিসেবে বিবেচনা করা যায় এবং কোনো ব্যক্তি মুসলিম হলে তিনি ‘নিশ্চিতভাবেই কম ব্রিটিশ’।

ডাউনসের এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে কারও ব্রিটিশ পরিচয়কে কম মূল্য দেওয়া বৈষম্যমূলক এবং বিভাজন সৃষ্টিকারী বক্তব্য।

হাউস অব লর্ডসের সদস্য এবং মুসলিম উইমেন’স নেটওয়ার্ক ইউকের নেত্রী ব্যারনেস গোহির বলেন, ব্রিটেনের খ্রিস্টান ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে অবশ্যই সম্মান করা উচিত। তবে সেই ইতিহাসকে ব্যবহার করে মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষকে ব্রিটিশ পরিচয়ের বাইরে রাখা যায় না। তার মতে, সাম্প্রতিক জনগণনায় ৩৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছিলেন যে তাদের কোনো ধর্ম নেই। ফলে শুধু ধর্মকে ব্রিটিশত্বের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করলে সমাজের বড় একটি অংশই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

গোহির আরও বলেন, ব্রিটিশ পরিচয় মূলত দেশের প্রতি মানুষের অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি, সমাজে অবদান রাখা, আইন ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করা এবং সহনাগরিকদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তার মতে, বৈচিত্র্যের মধ্যেও ব্রিটিশ পরিচয় ও দেশপ্রেম মানুষের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করার বিষয় হওয়া উচিত, বিভাজনের কারণ নয়।

মুসলিমস এগেইনস্ট অ্যান্টি-সেমিটিজমের ফিয়াজ মুগালও ডাউনসের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, এ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে মুসলিম ও ইহুদিদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ব্রিটেনে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। তিনি রিস্টোর ব্রিটেনের রাজনীতিকে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সঙ্গে যুক্ত করে দলটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের আহ্বান জানান।

এদিকে ডাউনসের বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন রিস্টোর ব্রিটেনের নেতা রুপার্ট লোয়ের ব্রিটিশ পরিচয় ও জাতিগত পরিচয় নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়েও বিতর্ক চলছে। ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসকে ‘হোয়াইট ব্রিটন’ বলা যায় কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন লো। তার বক্তব্যে ব্রিটিশ পরিচয় কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।

রিস্টোর ব্রিটেন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রিফর্ম ইউকে থেকে বেরিয়ে আসা রুপার্ট লোয়ের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। লো নিজে জাতিগত জাতীয়তাবাদ ও নব্য-নাৎসিবাদের বিরোধিতা করেছেন। তবে দলটির কিছু সমর্থক ও কর্মীর বক্তব্য নিয়ে ইতোমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সমালোচকেরা।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে রিস্টোরের কয়েকজন কর্মী ও সমর্থকের অভিবাসন ও ‘রিমাইগ্রেশন’ সংক্রান্ত বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। দলটির কর্মী লুসি হোয়াইট এমন একটি নীতির পক্ষে কথা বলেছেন, যার মাধ্যমে অ-ব্রিটিশ হিসেবে বিবেচিত বিপুলসংখ্যক মানুষকে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিতে বিদেশিদের উপস্থিতিরও সমালোচনা করেছেন এবং দেশের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন।

রিস্টোরের আরেক আলোচিত সমর্থক স্টিভ লজও সব অশ্বেতাঙ্গ ও অ-খ্রিস্টান মানুষকে ‘সম্পূর্ণ রিমাইগ্রেশনের’ আওতায় আনার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার কিছু বক্তব্য নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অ্যান্টি-সেমিটিজমবিরোধী প্রচারণাকারীরাও রিস্টোরের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট অ্যান্টি-সেমিটিজমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করার দাবি এবং শুধু ‘শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ’ বা খ্রিস্টানদের জন্য ব্রিটিশ পরিচয় সংরক্ষণের দাবি এক বিষয় নয়। তাদের মতে, অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্যকে এক করে দেখা উচিত নয়।

সমালোচকদের আশঙ্কা, ব্রিটিশত্বকে ধর্ম, বর্ণ বা বংশপরিচয়ের সংকীর্ণ সংজ্ঞায় আবদ্ধ করার চেষ্টা দেশটির বহুত্ববাদী সমাজে বিভাজন আরও বাড়াতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে এ ধরনের বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

তবে রিস্টোর ব্রিটেনের রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ব্রিটিশ পরিচয়ের ভিত্তি কি ধর্ম ও বংশপরিচয়, নাকি নাগরিকত্ব, আইন মেনে চলা, সমাজে অবদান এবং দেশের প্রতি আনুগত্য? চার্লি ডাউনসের মন্তব্য সেই পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

আশ্রয়প্রার্থীদের বয়স যাচাইয়ের আইন করছে যুক্তরাজ্য

ব্রিটেনে আত্মনির্ভরতার পথে বাংলাদেশি পরিবারঃ বেনিফিট নেওয়ার প্রবণতা কমছে

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চূড়ান্ত দৌড়ে সুনাক ও ট্রাস