21.8 C
London
September 19, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে দক্ষিণ এশীয় নারীদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগঃ আলোচনায় ‘মিসেস বিবি সিনড্রোম’

দক্ষিণ এশীয় নারীরা ব্যথা বা অসুস্থতার উপসর্গ অতিরঞ্জিত করেন—এমন ধারণা থেকে কিছু স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবহৃত ‘মিসেস বিবি সিনড্রোম’ বা ‘মিসেস বেগম সিনড্রোম’ শব্দটি নিয়ে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে (এনএইচএস) জাতিগত ও লিঙ্গভিত্তিক স্টেরিওটাইপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

‘মিসেস বিবি সিনড্রোম’ কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা রোগ বা রোগ নির্ণয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত ‘বিবি’ ও ‘বেগম’ নামকে ব্যবহার করে এমন একটি স্টেরিওটাইপ বোঝানো হয়, যেখানে কোনো নারী নিজের ব্যথা বা অসুস্থতার কথা অতিরঞ্জিত করছেন অথবা তার বক্তব্যকে অবিশ্বস্ত মনে করা হচ্ছে।

সম্প্রতি জার্নাল অব ব্রিটিশ স্টাডিজ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ‘মিসেস বিবি’ বা ‘মিসেস বেগম সিনড্রোম’কে দক্ষিণ এশীয় নারীদের অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বা অসত্যবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য চিকিৎসকদের ব্যবহৃত অবমাননাকর শব্দ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

লেস্টার গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে আনিকা নামের এক দক্ষিণ এশীয় নারী লেস্টারের গ্লেনফিল্ড হাসপাতালে পিত্তথলির অস্ত্রোপচারের পর গুরুতর স্বাস্থ্য উপসর্গে ভুগছিলেন। তার মেয়ে লায়লার দাবি, তার মা বারবার হাসপাতালের কর্মীদের জানিয়েছিলেন যে তার শরীরে গুরুতর সমস্যা হচ্ছে।

লায়লার বক্তব্য অনুযায়ী, আনিকা কাঁপছিলেন এবং আতঙ্কিত ছিলেন। কিন্তু তাকে বলা হয়েছিল তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অথবা সমস্যাটি তার কল্পনা। আনিকা ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তার অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে দাবি করা হয়।

পরে তার বোন, যিনি একজন চিকিৎসা পেশাজীবী, হস্তক্ষেপ করলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। তখন জানা যায়, অস্ত্রোপচারের সময় তার অন্ত্রে ছিদ্র হয়েছিল।

লায়লার ভাষ্য অনুযায়ী, এই জটিলতার কারণে আনিকার সেপটিক শক হয়। তাকে জরুরি অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পরিচর্যায় নিতে হয় এবং পরবর্তীতে তিনি আজীবন প্রতিবন্ধিতার শিকার হন।

সাউথ এশিয়ান হেলথ ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি ড. সারাহ আলি বিষয়টিকে চিকিৎসাব্যবস্থায় নারীদের উপসর্গ উপেক্ষা করার দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিকভাবে চিকিৎসকদের বড় অংশ পুরুষ ছিলেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরুষদের স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ড. আলি বলেন, অতীতে নারীদের ব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গকে ‘হিস্টেরিয়া’র সঙ্গে যুক্ত করে অনেক সময় যথাযথভাবে তদন্ত করা হতো না। তার মতে, নারীদের উপসর্গ উপেক্ষার এই ঐতিহাসিক প্রবণতার সঙ্গে ‘মিসেস বিবি’ বা ‘মিসেস বেগম সিনড্রোম’-এর মতো স্টেরিওটাইপের সম্পর্ক রয়েছে।

তবে তথাকথিত এই সিনড্রোমের ব্যাপ্তি নির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করার মতো গবেষণা সীমিত। এ বিষয়ে পাওয়া অনেক তথ্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্যকর্মী ও অধিকারকর্মীদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল।

দক্ষিণ এশীয় পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাবও নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বাধা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লায়লার মতে, কিছু দক্ষিণ এশীয় পরিবারে স্বাস্থ্য সমস্যা ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় নারীদের নিজেদের উপসর্গ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা কঠিন হতে পারে।

ড. আলি মাসিক ও প্রজননস্বাস্থ্যের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। তার মতে, কিছু দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ে মাসিক এখনও সংবেদনশীল বা ট্যাবু বিষয় হওয়ায় নারীদের এ ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা কঠিন হতে পারে।

২০২৬ সালের একটি গুণগত গবেষণাতেও দেখা গেছে, কিছু ব্রিটিশ দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রজনন ও যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা এখনও অত্যন্ত ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়। এর ফলে মেনোপজ সম্পর্কে আলোচনা ও সচেতনতা সীমিত থাকতে পারে।

স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশীয় নারীদের নিয়ে বৈষম্যের তথ্য সামনে এসেছে। ব্রেস্ট ক্যানসার নাউয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩ সময়কালের এনএইচএস তথ্যের ভিত্তিতে ইংল্যান্ডে ১৮ থেকে ৭১ বছর বয়সী দক্ষিণ এশীয় নারীদের শ্বেতাঙ্গ নারীদের তুলনায় স্তন ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়ার হার কম ছিল।

দাতব্য সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশীয় নারীদের সেকেন্ডারি ব্রেস্ট ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার হারও বেশি।

২০২৫ সালে কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক ক্লদ শেলালার নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় ৭ হাজারের বেশি নারীর ক্লিনিক্যাল ও জেনেটিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত নারীদের স্তন ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার বয়স এবং মৃত্যুর বয়সে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত নারীদের সঙ্গে পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে।

তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্তন ক্যানসারের ফলাফল সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগের কিছু গবেষণায় ভিন্ন ফলাফলও পাওয়া গেছে।

মাতৃস্বাস্থ্যেও জাতিগত বৈষম্যের তথ্য রয়েছে। ২০২০-২২ সময়কালের এমবিআরআরএসিই-ইউকের মাতৃমৃত্যু প্রতিবেদনে এশীয় জাতিগত গোষ্ঠীর নারীদের মাতৃমৃত্যুর হারে শ্বেতাঙ্গ নারীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পার্থক্য পাওয়া যায়।

সাউথ এশিয়ান হেলথ ফাউন্ডেশন এমবিআরআরএসিই-ইউকের তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে, ওই সময়ে প্রতি এক লাখ প্রসবের বিপরীতে এশীয় নারীদের মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ১৭ দশমিক ৬, যেখানে শ্বেতাঙ্গ নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৭।

মুসলিম উইমেনস নেটওয়ার্ক মাতৃস্বাস্থ্য সংক্রান্ত নথিতে জাতিগত পরিচয়ের তথ্য আরও নির্ভুলভাবে সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, নির্দিষ্ট উপ-জাতিগত গোষ্ঠীর তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, কারণ বড় জাতিগত শ্রেণিবিভাগের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

লেস্টারে লেস্টার মামাস এবং লেস্টার, লেস্টারশায়ার অ্যান্ড রাটল্যান্ড ম্যাটারনিটি অ্যান্ড নিওনেটাল ভয়েসেস পার্টনারশিপসহ বিভিন্ন সংগঠন স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে কাজ করছে। এসব উদ্যোগে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা শোনা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

লায়লা স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা এবং কোনো রোগ কীভাবে শরীরে প্রভাব ফেলে তা বোঝানো প্রয়োজন।

ড. আলি দ্রুত স্ক্রিনিং ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। স্তন ক্যানসার, জরায়ুমুখের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন।

তিনি স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের সাংস্কৃতিক বিষয়ে আরও দক্ষ করে তোলা এবং চিকিৎসা গবেষণায় জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ড. আলির মতে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে গবেষণায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে রোগ ও চিকিৎসা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে তা আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব। পর্যাপ্ত গবেষণার ভিত্তিতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির সুযোগও তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবায় অচেতন পক্ষপাত ও বর্ণবাদ নিয়ে উদ্বেগ এখনও রয়েছে। দক্ষিণ এশীয় নারীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাদের উপসর্গ মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সূত্রঃ ব্রেস্ট ক্যানসার নাউ\জার্নাল অব ব্রিটিশ স্টাডিজ

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্য ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’—ইরানের হুমকিঃ ব্রিটিশ রাজপরিবারকেও কড়া বার্তা

নিউজ ডেস্ক

আমার মেয়েই তাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেঃ ঋষি সুনাকের শাশুড়ি

যুক্তরাজ্যে কেয়ার ওয়ার্কার ভিসার গোলকধাঁধা ফেঁসে গিয়েছেন প্রবাসী কর্মীরা