ব্রিটেনে তামাক বিক্রির ক্ষেত্রে আসছে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। নতুন আইন কার্যকর হলে ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি বা তার পর জন্ম নেওয়া কোনো ব্যক্তির কাছে আইনত সিগারেট বা অন্যান্য তামাকজাত পণ্য বিক্রি করা যাবে না। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই আইনের আগে আর মাত্র ১০০ দিন বাকি থাকতেই ধূমপান ছাড়তে বর্তমান ধূমপায়ীদের উৎসাহিত করতে বড় ধরনের প্রচারাভিযান শুরু করেছে এনএইচএস ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলো।
দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ মানুষ ধূমপান করেন। তাদের লক্ষ্য করে শুরু হয়েছে “হোয়াট উইল ইউ মিস?” নামে নতুন প্রচারাভিযান। ধূমপানের কারণে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ও মুহূর্তগুলো হারানোর বিষয়টি সামনে এনে ধূমপায়ীদের এই অভ্যাস ছাড়তে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
নতুন আইনটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধূমপান থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। তবে বর্তমানে যারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং ধূমপান করেন, তাদের সিগারেট কেনার ওপর এই আইন সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। অর্থাৎ, বর্তমানে বৈধ বয়সে থাকা ধূমপায়ীরা আগের মতোই তামাক কিনতে পারবেন।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা এনএইচএস জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে ধূমপান প্রতিরোধযোগ্য অসুস্থতা ও অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর এই অঞ্চলে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ মানুষ ধূমপানজনিত অসুস্থতায় মারা যান। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮ জনের মৃত্যু ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই পরিস্থিতিতে স্মোকফ্রি সাউথ ওয়েস্ট নামে ১৫টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অংশীদারিত্বে নতুন প্রচারাভিযানটি শুরু হয়েছে। এনএইচএসের সহযোগিতায় পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করতে এবং বিনামূল্যে স্থানীয় সহায়তা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
প্রচারাভিযানের কেন্দ্রীয় ভিডিওতে একজন নববধূকে বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা যায়। তবে সেখানে অনুপস্থিত থাকেন এমন একজন, যাকে তিনি সবচেয়ে বেশি পাশে চেয়েছিলেন। ভিডিওটির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে—ধূমপান শুধু মানুষের জীবনের কয়েক বছর কেড়ে নেয় না, বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত থেকেও মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি ধূমপায়ীর ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অনেকেই ধূমপান ছাড়তে চান। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
জরিপে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ধূমপান ছাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলেও প্রায় তিনজন ধূমপায়ীর মধ্যে দুজনের বর্তমানে ধূমপান ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। অধিকাংশ ধূমপায়ী অন্তত একবার ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করলেও অনেকের সফল হওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাস কম।
এনএইচএস ইংল্যান্ড সাউথ ওয়েস্টের ডেপুটি মেডিকেল ডিরেক্টর হেইন লে রু বলেন, প্রতি বছর দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ ধূমপানজনিত অসুস্থতায় মারা যান। তার মতে, প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
তিনি জানান, দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডকে ২০৩০ সালের মধ্যে ধূমপানমুক্ত অঞ্চল করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অংশীদার একসঙ্গে কাজ করছে। বর্তমান ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
নর্থ সমারসেট কাউন্সিলের জনস্বাস্থ্য পরিচালক এবং স্মোকফ্রি সাউথ ওয়েস্টের সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পনসর ম্যাট লেনি বলেন, ১০০ দিন পর জন্ম নেওয়া একটি শিশু এমন একটি দেশে বেড়ে উঠবে, যেখানে তাকে আইনত কখনো সিগারেট বিক্রি করা যাবে না।
তিনি বলেন, নতুন আইনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলেও বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে ধূমপান করা ৫ লাখ মানুষের ক্ষেত্রে এটি কোনো পরিবর্তন আনবে না। বরং তাদের ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করাই বর্তমান প্রচারাভিযানের উদ্দেশ্য।
ম্যাট লেনির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত সহায়তা পেলে ধূমপায়ীদের সফলভাবে ধূমপান ছাড়ার সম্ভাবনা তিন গুণ বেশি হতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে বিনামূল্যে ধূমপান ছাড়ার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
অ্যাকশন অন স্মোকিং অ্যান্ড হেলথ বা এএসএইচ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হ্যাজেল চিজম্যান বলেন, অধিকাংশ ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে চান, কিন্তু এটি কঠিন। তার মতে, ধূমপান ছাড়ার ইচ্ছাকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে এ ধরনের প্রচারাভিযান প্রয়োজন।
এনএইচএস গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনস্বাস্থ্য কৌশলগত প্রধান জেসিকা হলোওয়ে জানান, “হোয়াট উইল ইউ মিস?” প্রচারাভিযানটি গ্রেটার ম্যানচেস্টারে ধূমপায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে তৈরি করা হয়েছিল। ধূমপান তাদের জীবন থেকে কী কী কেড়ে নিচ্ছে, সেটি সহায়ক ও বিচারহীনভাবে তুলে ধরাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
এনএইচএস জানিয়েছে, শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করার তুলনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে ধূমপান ছাড়ার সফলতার সম্ভাবনা বেশি। দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের স্থানীয় স্টপ স্মোকিং সার্ভিসগুলোতে বিনামূল্যে নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি এবং ভ্যাপিং স্টার্টার কিট দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতাদের কাছ থেকে ধূমপান ছাড়ার বিভিন্ন প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি সম্পর্কেও পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে।
১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই আইন অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০০৯ বা তার পর জন্ম নেওয়া ব্যক্তির কাছে আইনত তামাক বিক্রি করা যাবে না। এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে নতুন প্রজন্মকে তামাকের বিক্রয় থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
সূত্রঃ ডেইলি মিরর, এনএইচএস, স্মোকফ্রি সাউথ ওয়েস্ট ও অ্যাকশন অন স্মোকিং অ্যান্ড হেলথ (এএসএইচ)
এমকে

