ব্রিটেনের ম্যানচেস্টারে বিরল ধরনের মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত ৩১ বছর বয়সী এক তরুণ বাবাকে চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে ১২ থেকে ১৮ মাস বেঁচে থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। মুখে ঝিনঝিন অনুভূতি নিয়ে প্রথমে দন্তচিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন জেমি কিহো। কিন্তু সেখানে সমস্যার কোনো কারণ খুঁজে না পাওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার মস্তিষ্কের কাণ্ডে দ্রুত বর্ধনশীল ক্যানসার শনাক্ত হয়।
ডেইলি মিররের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের স্ট্রেটফোর্ড এলাকার বাসিন্দা জেমি আগে বিপণন ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। শুরুতে তিনি মুখের ঝিনঝিন অনুভূতিকে দাঁতের সমস্যা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে হাঁটাচলায় ভারসাম্য হারানো, বারবার হোঁচট খাওয়া এবং হাত থেকে চাবি পড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
জেমির স্ত্রী হান্না লক্ষ্য করেন, তিনি তাদের পোষা কুকুরটির ওপর বারবার হোঁচট খাচ্ছেন। এরপর স্ত্রী তাকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য জোর দেন। জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে উদ্বিগ্ন হন এবং ২০২৪ সালে তাকে সরাসরি সালফোর্ড রয়্যাল হাসপাতালে পাঠান।
সেখানে স্ক্যান করে তার মস্তিষ্কের কাণ্ডে একটি অস্বাভাবিক পিণ্ডের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে বায়োপসির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, তিনি চতুর্থ গ্রেডের গ্লিওব্লাস্টোমায় আক্রান্ত। এটি দ্রুত বর্ধনশীল ও অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ম্যালিগন্যান্ট মস্তিষ্কের টিউমার।
জেমি জানান, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর প্রাথমিক মূল্যায়নেই বোঝা গিয়েছিল, তার শরীরে গুরুতর কিছু ঘটছে। স্ক্যানের পরামর্শ দেওয়া হলেও পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি ধারণা পেয়েছিলেন। পরে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকই তাকে বায়োপসির ফলাফল জানান। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে জেমি বলেন, খবরটি শোনার পর তার মনে হয়েছিল, চারপাশের সবকিছু যেন বন্ধ হয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে যেসব ছুটি কাটানো ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেগুলো যেন হঠাৎ করেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
চিকিৎসকদের প্রাথমিক পূর্বাভাস ছিল, চিকিৎসা নিলে তিনি আনুমানিক ১২ থেকে ১৮ মাস বেঁচে থাকতে পারেন। তার টিউমারটি অত্যন্ত বিরল একটি জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানানো হয়। মস্তিষ্কের কাণ্ডে টিউমারটির অবস্থানের কারণে অস্ত্রোপচার করে তা অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।
এরপর ম্যানচেস্টারের ক্রিস্টি হাসপাতালে ছয় সপ্তাহ ধরে রেডিওথেরাপি নেন জেমি। তবে চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার দৃষ্টিশক্তি ও স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি জানান, মস্তিষ্কের কাণ্ডে ক্যানসার হওয়ার কারণে দৈনন্দিন কাজও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। গোসল করা কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মতো সাধারণ কাজ করতেও তাকে অনেক বেশি কষ্ট করতে হয়।
ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর জেমি ও হান্না তাদের বিয়ের তারিখ এগিয়ে আনেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তারা বিয়ে করেন এবং ওই শীতেই কর্নওয়ালে মধুচন্দ্রিমা কাটান। পরে নতুন একটি ক্যানসারের ওষুধের পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় অংশ নেন জেমি। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তিনি ওই ওষুধ গ্রহণ করেন।
প্রথম দফার রেডিওথেরাপিতে টিউমারটি ছোট হয়ে আসায় প্রায় আট মাস তিনি তুলনামূলক স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পেরেছিলেন। এ সময় জেমি ও হান্না আইভিএফ বা কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার উদ্যোগ নেন। তাদের ছেলে এলিয়টের জন্ম হয়, যার বয়স এখন ছয় মাস।
কিন্তু সন্তানের জন্মের কাছাকাছি সময়ে জেমির উপসর্গগুলো আবার ফিরে আসে। নতুন করে স্ক্যান করার পর দেখা যায়, টিউমারটি আবারও বড় হয়েছে। এরপর তিনি দ্বিতীয় দফায় রেডিওথেরাপি নেন, যা চলতি বছরের মে মাসে শেষ হয়।
বর্তমানে কথা বলতেও সমস্যায় পড়ছেন জেমি। তবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেছেন। তার প্রথম কবিতার সংকলনের নাম ‘আই ইউজড টু রাইট স্টোরিজ’। এই বই থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ মস্তিষ্কের টিউমার নিয়ে গবেষণার কাজে ব্যয় করা হবে।
জেমি বলেন, ক্যানসার যে কতটা নিষ্ঠুর এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কতটা কঠিন করে তুলতে পারে, তা তুলে ধরতে চান তিনি। একই সঙ্গে সবচেয়ে খারাপ খবর শোনার পরও যে জীবন থেমে যায় না, সেই বার্তাও দিতে চান।
তিনি বলেন, রোগ নির্ণয়ের পর থেকে তিনি যা কিছু করেছেন, সেগুলো তার নিজের ইচ্ছার কাজ। নিজের ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করার চেয়ে তিনি সময়ের সদ্ব্যবহার করতে চান। বিয়ের তারিখ এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে শুধু রোমান্টিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন না তিনি; বরং তার কাছে সেটি ছিল সময়ের সীমাবদ্ধতার বাস্তবতা মেনে নেওয়া।
জেমি তার কবিতার মাধ্যমে মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে বসবাসের বাস্তবতা, অসহায়ত্ব এবং জীবনের অবশিষ্ট সময়কে অর্থবহ করে তোলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। আগামী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর স্ট্রেটফোর্ডের আনঅফিশিয়াল মিউজিয়ামে তার কবিতা প্রদর্শিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্রঃ ডেইলি মিরর
এমকে

