TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

‘ব্রেক্সিটের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’—রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনায় ক্ষুব্ধ ইউরোপীয় নাগরিকরা

যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসরত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নাগরিকদের অধিকার সীমিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে। দলটির নতুন অভিবাসন নীতিতে বিদেশি নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান ও সামাজিক আবাসনের সুযোগ কঠোরভাবে সীমিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী এবং ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’ পাওয়া ইইউ নাগরিকদের মধ্যেও তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক আবাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিদেশি কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হবে, যাতে বিদেশি নাগরিক নিয়োগ করা কোম্পানিগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

বর্তমান ব্রেক্সিট চুক্তি অনুযায়ী, ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’ধারী ইইউ নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস, কাজ করা, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা ও পেনশন পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাদের পরিবারের সদস্যরাও একই ধরনের অধিকার ভোগ করেন। তবে রিফর্ম ইউকের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ব্রেক্সিট চুক্তি পুনরায় আলোচনায় বসতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ নিলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সদস্য দেশগুলোতে বসবাসরত ব্রিটিশ নাগরিকদের ওপরও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। পাশাপাশি নতুন বাণিজ্যিক বাধাও সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রিফর্ম ইউকের ট্রেজারি বিষয়ক মুখপাত্র রবার্ট জেনরিক নতুন পরিকল্পনাকে ‘মাইগ্র্যান্টস লেবার লেভি’ বা অভিবাসী শ্রম কর হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিলে নিয়োগকর্তাদের অতিরিক্ত জাতীয় বীমা (ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স) দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতি বছর আলাদা একটি ফিও গুনতে হবে, যা কম আয়ের কর্মীদের ক্ষেত্রে আরও বেশি হবে। জাতীয় ন্যূনতম মজুরিতে কর্মরত একজন বিদেশি কর্মীর জন্য বছরে প্রায় তিন হাজার ৭৫০ পাউন্ড পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।

জেনরিক আরও বলেন, বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও, কিংবা ব্রিটিশ স্বামী বা স্ত্রী ও সন্তান থাকলেও ইইউ নাগরিকদের জন্য কোনো বিশেষ ছাড় থাকবে না। তার ভাষায়, অতিরিক্ত করের কারণে কেউ চাকরি হারালে তাদের যুক্তরাজ্য ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

এদিকে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ইইউ নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন দ্য থ্রি মিলিয়ন এই পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির দাবি, ব্রেক্সিট গণভোটের সময় ইইউ নাগরিকদের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, রিফর্ম ইউকের নতুন নীতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সংগঠনটির প্রতিনিধি ড্যানিয়েল সোহেগে বলেন, গত এক দশক ধরে ইইউ নাগরিকরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। ব্রেক্সিটের আগে এবং পরে তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। এখন আবার সম্ভাব্য একটি রিফর্ম সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের নাগরিক নিকোল, যিনি ৩৭ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, বলেন নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে তিনি চাকরি হারিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যই এখন তার বাড়ি। এখানে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন। বছরের পর বছর নিয়ম মেনে বসবাস করা মানুষদের প্রতি এমন আচরণ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দলের ইউরোপবিষয়ক মুখপাত্র আল পিংকার্টন বলেছেন, যুক্তরাজ্যে নিজেদের জীবন গড়ে তোলা লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে এভাবে অনিশ্চয়তা তৈরি করলে দেশের অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরবে না, বরং যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি শক্তিশালী করা, নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিবর্তে রিফর্ম ইউকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধাঁচের কঠোর ও বিভাজনমূলক রাজনীতি অনুসরণ করছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

রিফর্ম ইউকের এই নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ব্রেক্সিটের পর স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার পাওয়া লাখো ইইউ নাগরিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

নববর্ষের আতশবাজি প্রদর্শনী এবার ট্রাফালগার স্কোয়ারে

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের চাইল্ড বেনিফিট সুবিধা প্রসঙ্গে ৩১ আগস্টের আল্টিমেটাম

ইংল্যান্ডে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাড়ছে অপরাধ