TV3 BANGLA
মুক্তমত

ব্রেক্সিটের ব্যর্থতা: রাজনৈতিক কৌশলহীনতা, বিভ্রান্তিকর প্রতিশ্রুতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অদূরদর্শিতার সম্মিলিত ফল

নাশিত রহমান || ১৩ জুলাই ২০২৬ || লন্ডন

২০১৬ সালের ২৩ জুন যুক্তরাজ্যের গণভোট ছিল এক ঐতিহাসিক মোড়। ব্রেক্সিট প্রচারকারীরা দাবি করেছিলেন—ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে ব্রিটেন বছরে £৭৫০ মিলিয়ন অতিরিক্ত অর্থ NHS-এ ব্যয় করতে পারবে, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হবে, শিক্ষা ও শিল্পখাত স্বাধীনভাবে বিকশিত হবে, এবং ব্যবসা হবে “নিয়ন্ত্রণমুক্ত”। কিন্তু আট বছরের অভিজ্ঞতা দেখায়, এই প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, বাস্তবতার সঙ্গে যার সামান্যই মিল ছিল।

২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট শুধু যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রেও এক ব্যতিক্রমী মুহূর্ত। কারণ এই প্রথমবার দেখা গেল—বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তিগুলো একযোগে যুক্তরাজ্যের অভ্রন্তরীন গণভোট বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও জনগণের ভোট সেই বহির শক্তিকে উপেক্ষা করে। ব্রেক্সিট গণভোটে ৫২ শতাংশ ভোটার ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ বিপক্ষে ভোট দেন। এই ফলাফল ছিল এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা বিশ্বশক্তির সম্মিলিত প্রত্যাশাকে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেয়।
গণভোটের আগে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), জাতিসংঘ (UN), যুক্তরাষ্ট্র সরকার, ন্যাটো, ভ্যাটিকান এবং যুক্তরাজ্যের প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক দল ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল—ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে ব্রিটেন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হবে, বাণিজ্য সংকুচিত হবে, নিরাপত্তা সহযোগিতা কমে যাবে এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব কমে যাবে।

২০১৬ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত IMF বারবার সতর্ক করে বলেছিল—ব্রেক্সিট হলে যুক্তরাজ্যের জিডিপি দীর্ঘমেয়াদে ৪–৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক একই সময়ে জানায়—ব্রেক্সিট ব্রিটেনের বিনিয়োগ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করবে। ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্টভাবে জানায়—ইইউর একক বাজার থেকে বেরিয়ে গেলে ব্রিটেনকে কঠোর বাণিজ্য শর্ত মেনে চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এপ্রিল ২০১৬-তে লন্ডনে এসে বলেন—ব্রেক্সিট হলে যুক্তরাজ্য “trade deal-এর ক্ষেত্রে পিছনের সারিতে চলে যাবে।”
ন্যাটো সতর্ক করে জানায়—ইইউর বাইরে গেলে ব্রিটেনের নিরাপত্তা সহযোগিতা দুর্বল হতে পারে। ভ্যাটিকানও ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেয়, কারণ তারা মনে করেছিল ইউরোপীয় ঐক্য মানবিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে কনজারভেটিভ পার্টির বড় অংশ, লেবার পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, SNP—প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক দল ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়।

এই পরিস্থিতিতে ব্রেক্সিট প্রচারণা ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক বিদ্রোহ—বিশ্বশক্তির বিরুদ্ধে জনগণের সিদ্ধান্ত। ২৩ জুনের ভোটে ৫২ শতাংশ মানুষ ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি ছিল এমন এক গণতান্ত্রিক মুহূর্ত, যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক শক্তি জনগণের সিদ্ধান্তকে থামাতে পারেনি।
তবে এই ভোটের আরেকটি দিক ছিল আরও গভীর। ২০১৪ সালের স্কটিশ স্বাধীনতা গণভোটের সময় যুক্তরাজ্য সরকার বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিল—স্বাধীনতা পেলে স্কটল্যান্ডের মুদ্রা কী হবে, অর্থনীতি কীভাবে চলবে, সীমান্ত কীভাবে পরিচালিত হবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কীভাবে গড়ে উঠবে। কিন্তু ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকার বা প্রচারণা দল কোনও প্রস্তুতিমূলক নথি তৈরি করেনি। কোনও রোডম্যাপ ছিল না, কোনও কৌশল ছিল না, কোনও নীতি ছিল না। ভোটের আগে বা পরে কোনও পর্যায়েই স্পষ্ট করে বলা হয়নি—ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে কীভাবে বাণিজ্য চলবে, শ্রমবাজার কীভাবে স্থিতিশীল থাকবে, কিংবা অর্থনীতি কীভাবে রক্ষা পাবে। কোনও প্রস্তুতি নেই, কোনও নীতি নেই, কোনও কৌশল নেই—শুধু রাজনৈতিক রেটোরিক এবং বিভ্রান্তিকর প্রতিশ্রুতি।

 

এই প্রস্তুতিহীনতা ছিল এক অভূতপূর্ব প্রশাসনিক ব্যর্থতা। বিশ্বশক্তির বিরোধিতা সত্ত্বেও জনগণ ব্রেক্সিটকে সমর্থন করলেও সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ব্রেক্সিট প্রচারণার বিভ্রান্তিকর তথ্য, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক রেটোরিক ভোটারদের আবেগকে প্রভাবিত করলেও বাস্তবে কোনও পরিকল্পনা ছিল না।
ব্রেক্সিট গণভোট তাই একদিকে জনগণের রাজনৈতিক শক্তির বিজয়, অন্যদিকে সরকারের কৌশলগত ব্যর্থতার প্রতীক। বিশ্বশক্তির বিরোধিতা সত্ত্বেও জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়েছে—এটি গণতন্ত্রের শক্তির এক অনন্য উদাহরণ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রস্তুতিহীনতা ব্রিটেনকে আজ অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবহ্রাসের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
নাইজেল ফারাজ, ডমিনিক কামিংস এবং তাদের নেতৃত্বাধীন প্রচারণাদল সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়। ভুয়া সংবাদ, বিকৃত পরিসংখ্যান এবং আবেগময় বার্তা ব্যবহার করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা হয়। ইইউকে আমলাতান্ত্রিক দানব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন ব্রিটেন বেরিয়ে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু প্রচারণার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—ব্রেক্সিটের জন্য কোনও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছিল না। ভোটের আগে বা পরে কোনও পর্যায়েই সরকার বা প্রচারণা দল স্পষ্ট করে বলতে পারেনি—ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে কীভাবে বাণিজ্য চলবে, সীমান্ত কীভাবে পরিচালিত হবে, শ্রমবাজার কীভাবে স্থিতিশীল থাকবে, কিংবা অর্থনীতি কীভাবে রক্ষা পাবে।
এই প্রস্তুতিহীনতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ব্রেক্সিটের ফলাফল ঘোষণার পরপরই প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। সরকারে কোনও প্রস্তুতিমূলক নথি ছিল না, কোনও কৌশলগত পরিকল্পনা ছিল না, এবং কোনও জরুরি রোডম্যাপও ছিল না। এটি ছিল এক অভূতপূর্ব প্রশাসনিক ব্যর্থতা—একটি জাতীয় গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট জিতলে কী হবে, তার কোনও প্রস্তুতি না থাকা।

 

গণভোটের পরপরই প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগ রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা করে। নতুন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিলেও শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল—সরকারের হাতে কোনও সুসংগঠিত কৌশল নেই। ২০১৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সংসদে ব্রেক্সিট চুক্তি বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়া প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অভ্যন্তরীণ ঐক্য গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। ইইউর সঙ্গে আলোচনায় ব্রিটেন দুর্বল অবস্থানে পড়ে, কারণ দেশটির নিজস্ব অবস্থান ছিল অস্পষ্ট, পরিবর্তনশীল এবং রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত।
ব্রেক্সিট প্রচারণার আরেকটি বড় বিভ্রান্তি ছিল “নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যবসার সুযোগ” এবং “সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা”। বাস্তবে দেখা যায়—ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ব্যবসাগুলো অতিরিক্ত কাগজপত্র, সীমান্ত জটিলতা এবং বাজার সংকোচনের মুখে পড়েছে। শ্রমবাজারে অভিবাসী শ্রমিকের ঘাটতি কৃষি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা—সব খাতকে দুর্বল করেছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায়।

 

২০১৯ সালে বরিস জনসন ক্ষমতায় এসে “Get Brexit Done” স্লোগানকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তার সরকারের তাড়াহুড়ো করে করা চুক্তি ব্রিটেনের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর দেখা যায়—ইইউ বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় রপ্তানি কমছে, ছোট ব্যবসাগুলো অতিরিক্ত কাগজপত্রে বিপর্যস্ত, এবং শ্রমবাজারে অভিবাসী শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কৃষি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা—প্রায় সব খাতেই শ্রম সংকট অর্থনীতিকে দুর্বল করে তোলে।
নাইজেল ফারাজ, ডমিনিক কামিংস এবং তাদের নেতৃত্বাধীন প্রচারণা বারবার দাবি করেছিল—ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে ব্রিটেন প্রতি সপ্তাহে £৩৫০–£৭৫০ মিলিয়ন অতিরিক্ত অর্থ NHS-এ ব্যয় করতে পারবে।বাস্তবে NHS আজ আরও সংকটে—স্টাফ ঘাটতি, চিকিৎসা বিলম্ব, এবং অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী অভিবাসন নীতির কারণে ইউরোপীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা কমে গেছে, যা NHS-এর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবে ব্যর্থ হয়েছে। ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য নিজস্ব সীমান্ত নীতি চালু করলেও অভিবাসন সংখ্যা কমেনি; বরং নতুন ভিসা স্কিমের কারণে অভিবাসন আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে “সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ”কে ব্রেক্সিটের মূল সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিল, তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত অস্থিরতায়।

 

শিক্ষা ও শিল্পখাতেও ব্রেক্সিটের প্রভাব স্পষ্ট। ইইউর গবেষণা তহবিল হারানোয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পখাতে শ্রম সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত এবং বিনিয়োগ হ্রাস অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। ব্রেক্সিট প্রচারকারীরা যে “নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যবসার সুযোগ” দেখিয়েছিলেন, বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত জটিলতা এবং বাজার সংকোচনে।
২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের “মিনি বাজেট” অর্থনীতিকে আরও অস্থির করে তোলে। পাউন্ডের মূল্য পতন, ঋণ গ্রহণের খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে অনিশ্চয়তা ব্রেক্সিট-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে। ঋষি সুনাকের সরকার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও ব্রেক্সিটের কাঠামোগত ক্ষত এত গভীর যে তা স্বল্পমেয়াদে পূরণ করা সম্ভব নয়।
২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটকে সাধারণত রাজনৈতিক প্রচারণার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়—এটি শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, বরং যুক্তরাজ্যের প্রধান রাষ্ট্রীয় সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষেরও এক অভূতপূর্ব প্রস্তুতিহীনতা ও নীতিগত দুর্বলতার ফল। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (OBR), এক্সচেকার এবং অন্যান্য স্ট্যাটুটরি সংস্থা গণভোটের আগে ও পরে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা আজ প্রশ্নের মুখে। তারা রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছে, সতর্কতা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং ব্রেক্সিটের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে জনগণকে যথাযথ তথ্য দিতে পারেনি।

 

২০১৬ সালের মার্চে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সতর্ক করেছিল—ব্রেক্সিট হলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এই সতর্কতা ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং রাজনৈতিকভাবে সংযত। তৎকালীন গভর্নর মার্ক কার্নি একাধিকবার বলেছেন—ব্রেক্সিট অর্থনীতিতে “ঝুঁকি” তৈরি করবে। কিন্তু তিনি কখনও স্পষ্টভাবে বলেননি যে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য কোনও প্রস্তুতিমূলক নথি নেই, কোনও কৌশল নেই, এবং কোনও প্রশাসনিক কাঠামোও নেই। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের এই সতর্কতা ছিল রাজনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবে তা জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে।
অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (OBR) গণভোটের আগে কোনও পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। তারা বলেছিল—গণভোটের ফল অনিশ্চিত, তাই পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। কিন্তু এই অবস্থান ছিল নীতিগতভাবে দুর্বল। কারণ স্কটিশ স্বাধীনতা গণভোটের সময় OBR বিস্তারিত অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রকাশ করেছিল—স্বাধীনতা পেলে স্কটল্যান্ডের অর্থনীতি কীভাবে চলবে, বাজেট কীভাবে পরিচালিত হবে, এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি কী। ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রে তারা একই ধরনের মূল্যায়ন প্রকাশ করেনি। এটি ছিল এক ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
এক্সচেকার—যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়—গণভোটের আগে ব্রেক্সিটের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বলেছিল। কিন্তু তারা কখনও স্পষ্টভাবে বলেনি যে সরকারের হাতে কোনও প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনা নেই। তৎকালীন চ্যান্সেলর জর্জ অসবর্ন জুন ২০১৬-তে বলেছেন—ব্রেক্সিট হলে “তাৎক্ষণিক বাজেট সংকট” তৈরি হতে পারে। কিন্তু তিনি জনগণকে জানাননি যে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য কোনও নীতি কাঠামোই তৈরি করা হয়নি। এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে সংযত বক্তব্য, যা বাস্তবতার তুলনায় অনেক কম সতর্কতামূলক।

 

রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর এই ব্যর্থতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়—বিশ্বব্যাংক, IMF, EU, UN, US সরকার, ন্যাটো, ভ্যাটিকান এবং যুক্তরাজ্যের প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক দল ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তারা বারবার সতর্ক করেছিল—ব্রেক্সিট হলে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে, নিরাপত্তা সহযোগিতা দুর্বল হবে, এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব কমে যাবে। কিন্তু যুক্তরাজ্যের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো এই সতর্কতাকে যথাযথভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ব্রেক্সিট আজ স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে—রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালায়, কৌশলগত পরিকল্পনা যদি দুর্বল হয়, এবং রাষ্ট্র পরিচালনা যদি বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে একটি জাতির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে পড়তে বাধ্য। ব্রেক্সিট প্রচারকারীদের প্রতিশ্রুতি—NHS-এ অতিরিক্ত অর্থ, কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও শিল্পখাতের উন্মুক্ত বিকাশ, নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যবসার সুযোগ—সবই আজ রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক।
ব্রেক্সিট গণভোট তাই শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোরও এক অভূতপূর্ব ব্যর্থতা। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, OBR, এক্সচেকার এবং অন্যান্য স্ট্যাটুটরি সংস্থা রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছে, জনগণকে যথাযথ তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে, এবং ব্রেক্সিটের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্কতা দিতে পারেনি। তারা এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না।
ব্রেক্সিট আজ দেখিয়ে দিয়েছে—যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালায় এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থা প্রস্তুতিহীন থাকে, তবে একটি জাতির ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে পড়তে বাধ্য।
যুক্তরাজ্যের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি বছরের পর বছর ধরে ভুল সিদ্ধান্ত, অদূরদর্শী নেতৃত্ব এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ফল। ব্রেক্সিট আজ ব্রিটেনের জন্য একটি সতর্কবার্তা—রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যদি তথ্যভিত্তিক না হয়, তবে তার মূল্য দিতে হয় পুরো জাতিকে।

আরো পড়ুন

নেতারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে সাজা দেন শহরবাসী

রেন্ট গ্যারান্টি ইনস্যুরেন্স

বরিস জনসন এতো গরিব কেন!

অনলাইন ডেস্ক