17.9 C
London
August 22, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিকযুক্তরাজ্য (UK)

ভারতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে মামলার শিকার ব্রিটিশ ধর্মীয় নেতাঃ পরে আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন

ভারতে হিন্দুদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরের চেষ্টা করার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের গির্জা নেতা পঙ্কজ দেবনুরের বিরুদ্ধে করা মামলাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে দেশটির আইন প্রয়োগ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে এ কারণে যে, তার বিরুদ্ধে যে নতুন ধর্মান্তরবিরোধী আইনের ধারা ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি ঘটনার সময় কার্যকর ছিল না। পরে পুলিশ ওই আইনের ধারাগুলো মামলা থেকে বাদ দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

৫০ বছর বয়সী পঙ্কজ দেবনুর ম্যানচেস্টারে একটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দেন। গত ৭ আগস্ট ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনেতে একটি গির্জার ১৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে তিনি অভিযোগের মুখে পড়েন। অনুষ্ঠানটি ছিল ১০ দিনব্যাপী এবং সেখানে ধর্মীয় সংগীত ও বক্তব্যের আয়োজন ছিল। অনুষ্ঠানের মাঝেই কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করে ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলেন।

অভিযোগকারী ৩১ বছর বয়সী এক রিকশাচালক পুলিশের কাছে দাবি করেন, দেবনুর হিন্দুধর্ম সম্পর্কে ভুল ধারণা ছড়াচ্ছিলেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। পুলিশের নথিতে এমন অভিযোগের উল্লেখ থাকলেও দেবনুরের পরিবার পুরো ঘটনাটিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক সামনে আসে মামলার আইনি ভিত্তি নিয়ে। মহারাষ্ট্রের নতুন ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন ২০২৬-এর আওতায় প্রথম দিকের মামলাগুলোর একটি হিসেবে দেবনুরের বিরুদ্ধে মামলা করা হলেও পরে জানা যায়, আইনটি ২৮ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে ৭ আগস্টের ঘটনাকে ওই আইনের আওতায় আনার বিষয়টি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পুনে পুলিশ পরে স্বীকার করেছে যে আইনটি কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্দিষ্ট না থাকায় তারা ধরে নিয়েছিল এটি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।

পুনে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ধর্মান্তরবিরোধী আইনের ধারাগুলো মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে। তবে দেবনুরের বিরুদ্ধে অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিকসংক্রান্ত আইনসহ অন্যান্য আইনের অধীনে তদন্ত বা ব্যবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে।

আদালতের পর্যবেক্ষণও মামলাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের শুনানিতে আদালত বলেছে, অনুষ্ঠানে অন্য ধর্মের মানুষকে ধর্মান্তর করার উদ্দেশ্যে ডাকা হয়েছিল—এমন তথ্য কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। আদালতের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে অনুষ্ঠানটিকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছে, অনুষ্ঠানে প্রবেশে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকার অর্থ এই নয় যে সেখানে অন্য ধর্মের মানুষকে ধর্মান্তরের উদ্দেশ্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অভিযোগকারীসহ কয়েকজন ব্যক্তি অনুষ্ঠানটিকে হিন্দুদের একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন মনে করে সেখানে প্রবেশ করেছিলেন বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

দেবনুরকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হলেও আদালতের শর্ত অনুযায়ী তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া ভারত ছাড়তে পারবেন না। পাশাপাশি সপ্তাহে তিন দিন স্থানীয় থানায় হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। তার মূল জামিন আবেদনের পরবর্তী শুনানি ২৫ আগস্ট হওয়ার কথা রয়েছে।

দেবনুরের আইনজীবী জানিয়েছেন, তার মক্কেলকে ওই অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে পুলিশ দাবি করেছে, ভারতে তার নাগরিকত্বের বিশেষ মর্যাদা থাকলেও অনুমতি ছাড়া ধর্মীয় বক্তব্য বা প্রচার চালানোর অধিকার তার ছিল না।

ঘটনার পর দেবনুরের পরিবার যুক্তরাজ্যে তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পরিবারের দাবি, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নাম, ঠিকানা ও অবস্থান প্রকাশ পাওয়ায় তারা আতঙ্কিত। তারা তাকে দ্রুত ম্যানচেস্টারে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আইনি ব্যয় বহনের জন্য পরিবার একটি অর্থসংগ্রহের উদ্যোগও নিয়েছে। ১০ হাজার পাউন্ড সংগ্রহের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৬ হাজার ৬০০ পাউন্ডের বেশি অর্থ পাওয়া গেছে বলে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলাটি দেবনুরের কর্মজীবন ও আর্থিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলেছে।

ঘটনাটি ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্মান্তরবিরোধী আইন এবং আইন প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে কোনো আইন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার আগে সেটির ভিত্তিতে মামলা করার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দেবনুরের বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগ—তিনি সত্যিই ধর্মান্তরের চেষ্টা করেছিলেন কি না—তার চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। তাই অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তর জানিয়েছে, তারা ভারতে থাকা এক ব্রিটিশ নাগরিককে সহায়তা করছে এবং তার পরিবার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

ন্যূনতম মজুরি লঙ্ঘনঃ পূর্ব লন্ডনের উদয়া রেস্তোরাঁর লাইসেন্স স্থগিত

যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজে সৌদি তরুণের মৃত্যুঃ পরিবারের আবেগঘন শ্রদ্ধা

যুক্তরাজ্যের টিপটনে পুরনো লিডল ভেঙে দ্বিগুণ আকারের নতুন সুপারস্টোর নির্মাণ