TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত জাপানের ফুজিসাওয়াঃ অভিবাসন বিতর্কে নতুন মাত্রা

জাপানের কানাগাওয়া প্রিফেকচারের উপকূলীয় শহর ফুজিসাওয়ায় প্রথম মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক ও জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়ার পর থেকেই হাজারো বাসিন্দা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন এবং গণস্বাক্ষর অভিযানের মাধ্যমে তাদের আপত্তি জানিয়েছেন। বিষয়টি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জাপানে অভিবাসন, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে চলমান জাতীয় বিতর্কেরও প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

টোকিও থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত শান্ত সমুদ্রতীরবর্তী শহর ফুজিসাওয়ার বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, পরিকল্পিত মসজিদটি কাছাকাছি অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী শিন্তো উপাসনালয়ের তুলনায় অনেক বড় হবে এবং এটি এলাকার সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা নোরিকো ইজুমিজাওয়া বলেন, তার আশঙ্কা মূলত ভবিষ্যতে এলাকার সামাজিক পরিবেশ কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, তা নিয়ে। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ে চলমান বিতর্কও তার উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, জাপানে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক আচরণ বেড়েছে। প্রায় চার দশক ধরে ওসাকায় বসবাসরত শ্রীলঙ্কান ব্যবসায়ী মোহামেদ মোহিদিন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান, অপমানজনক মন্তব্য এবং মসজিদের সামনে এসে গালিগালাজ করার মতো ঘটনাও ঘটছে। তার ভাষায়, মুসলিমদের অনেক সময় অন্যায়ভাবে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করছে।

তবে তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেন, জাপানি সমাজের সঙ্গে আরও গভীর সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। তার মতে, ভুল ধারণা দূর করতে উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ।

সাইতামা প্রিফেকচারের ইয়াশিও মসজিদের প্রতিনিধি শাকিল মোহাম্মদও স্থানীয় সংস্কৃতি ও আইন-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, তাদের সম্প্রদায় আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, পার্কিং বিধি এবং অন্যান্য সামাজিক নিয়ম মেনে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, যাতে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের পেছনে জাপানের দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ কমে যায়। একই সময়ে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা প্রথমবারের মতো ৪০ লাখ অতিক্রম করে এবং কর্মরত বিদেশির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৫ লাখ ৭০ হাজারে।

ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদার তথ্য অনুযায়ী, জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা ২০১৯ সালের প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালের শেষে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে। এই দ্রুত বৃদ্ধি দেশটিতে ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

এদিকে, বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা বাড়লেও প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার বৃহৎ পরিসরের অভিবাসনের বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থান বজায় রেখেছে। সম্প্রতি বিদেশিদের জন্য ভিসা ফি পাঁচ গুণ বৃদ্ধি এবং অভিবাসন আইন বাস্তবায়নে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের ঘোষণা সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফুজিসাওয়ার মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি জাপানের সামনে থাকা একটি বড় বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছে—একদিকে জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন জাপান সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্রঃ জিবি নিউজ

এম.কে

আরো পড়ুন

ইংল্যান্ডে এশীয় পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা গড়ের তুলনায় ৭০% বেশি দাঁতের ক্ষয় ঝুঁকিতে

ভারতের সেনাপ্রধানের স্বীকারোক্তিঃ বহুমুখী সংকটে দিশেহারা ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

মিয়ানমারে এক রাজ্যের রাজধানী দখলের পথে বিদ্রোহীরা